দুই পুরুষ (উপন্যাস) পর্ব- ৭
দুই পুরুষ
এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন
উপন্যাস পর্ব-৭
তারপর থেকে শুরু হল তাদের প্রেমের আলাপ মােবাইলে । মােবাইলেই চলে শাসন,
অভিমান, রাগ সব কিছু। চাঁদ দেখা করতে চায় কিন্তু তুষার বলে একবারে বিয়ের
সময় তােমাকে দেখব।
মােবাইলে কিছু দিন প্রেম হবার পরে, তুষার এখন ক্লাসে
প্রেমের প্রস্তাব দিবে ঠিক করেছে। ক্লাসে এসে তুষার চাঁদকে বলল, চলাে আজকে
তােমার সংগে আমার কিছু কথা আছে ক্লাস করব না চলাে তিন তলায় গিয়ে এক রুমে
বসি। চাঁদ বলল, ঠিক আছে চল।
তিন তলায় গিয়ে বসল ফাকা এক রুমে।
-আচ্ছা চাঁদ
তােমাকে একটা কথা বলব কিছু মনে করবে নাতাে ?
-না বল, যে কোন কথা তুমি আমাকে
বলতে পার।
-আচ্ছা তােমার মনের মধ্যে কি কেউ বাস করে?
- কেন হঠাৎ এরকম প্রশ্ন
কেন ?
-না এমনি জানতে চাচ্ছি তাই, তুমি প্রশ্ন না করে শুধু উত্তর দিলে খুশি
হব।
- চাঁদ ঠোট উলটে মাথা নেড়ে বলল, না কেউ নেই।
-সত্যিই কেউ বাস করে না ?
-
বললাম তাে না।
-তুষার বলল, তােমার মনের ঐ জায়গায় আমি থাকতে চাই। জায়গা
দেবে?
লজ্জায় চাঁদের সাদা মুখ লাল হয়ে গেছে, মাথা নিচু করে আছে, কিছু
বলতে পারছে না।
তুষার মনে মনে ভাবছে, যদি রাজি না হয় তাহলে খুশি। কারণ
বুঝবে মােবাইলের ছেলেকে সত্যি সত্যিই মন দিয়ে দিয়েছে। আর যদি রাজি হয়
তাহলে আর বােঝার বাঁকি রইল না।
অনেক্ষণ চুপ থাকার পর তুষার বলল, কি ব্যাপার
চুপ করে আছাে কেন ? আমাকে জায়গা দিবে না ? ঠিক আছে আজ না বললে কালকে
বলাে। ২৪ ঘন্টা সময় নাও। এই বলে তুষার রুম থেকে বের হয়ে গেল।
রাতে তুষার
কল করেছে।
-হ্যালাে জানু কি করছাে ?
-না তেমন কিছু না, এমনি বই নিয়ে বসে আছি।
-কি ব্যাপার তােমার কি মন খারাপ?
তুষার
ফোন করল ঐ বন্ধুর কাছে।
-
না তেমন কিছু না মাথাটা একটু ব্যথা করছে।
- ঠিক আছে আজ তাহলে কথা বলব না
তুমি ঘুমাও।
-চাঁদ বলল, ঠিক আছে।
রাতে ঘুম নেই কারাে। চাঁদ চিন্তা করে কি
করবে সে আর তুষার চিন্তা করে কি বলবে সে।
পরের দিন ক্লাসে না গিয়ে
রেস্টুরেন্টে বসেছে তারা। তুষারের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে চাঁদ, তুষার
মনে মনে মন খারাপ করলেও উপরে উপরে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিল।
- চাঁদ বলল,
তােমার মােবাইল নাম্বার নেই ?
-মােবাইল ইউজ করি না। মােবাইল থাকলেই ঝামেলা,
কে কখন কোথায় কল করে ডাকে তার ঠিক নেই। তার চেয়ে না থাকাই ভাল, আমার যখন
যার কাছে প্রয়ােজন হয় তখন তার কাছে দোকান থেকে কল করি । আর তােমার
সাথেতাে প্রত্যেক দিন কলেজে দেখা হয়, মােবাইলের তাে প্রয়ােজন হচ্ছে না।
-
তা অবশ্য ঠিক।
তুষার যখন ক্লাস করতে আসে তখন মোবাইল নিয়ে আসে না। আর
মােবাইলে কথা বললে সে ধরা পরে যাবে তাই ঠিক করেছে যত বড়ই প্রয়ােজন হক না
কেন মােবাইলে সে কথা বলবে না।
চলছে প্রেম ধুমছে, রাতে হয়। বাইলে আর দিনে
হয় ক্লাসে। মেয়েরা যে এতাে সুন্দর অভিনয় করতে পারে হারে হারে টের পাচ্ছে
তুষার। মােবাইলে এমন ভাবে চাঁদ কথা বলে মনে হয় জীবনে কোন দিন ছেলেদের মুখ
দেখে নি। আবার ক্লাসে যখন কথা হয় তুষার ছাড়া আর কেউ নেই চাঁদের, বাবা
মাও পর। মােবাইলের প্রেম তাে মােবাইলে চলছেই কিন্তু ক্লাসের প্রেম আর
ক্লাসে নেই, সেটা হয় এখন বিভিন্ন পার্কে, রেস্টুরেন্টে, রিক্সায়, বা
সি.এন.জিতে কিন্তু বৃষ্টির সময় রিক্সায় একটু ভাল লাগে। কেন ভাল লাগে আজ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে খুব সন্দর করে বর্ণনা দিতে পারতেন। কারণ
তিনি এ ব্যাপারে আসল রূপ বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।
সত্যিই তাে তাই আমরা বেঁচে থাকি দুটি কারণে, আমাদের জীবন গতিময় হয় এক
নিজের উত্তেজনার পিছনে আর এক বাঁচার তাগিদে। একজন মেয়ের সাথে কথা বলতে কেন
যে ভাললাগে কেউ জানে না, শুধু ভাল লাগে আর ভাল লাগে। মােবাইলের টাকাও শেষ,
কথাও শেষ। এটাই মানুষের উত্তেজনা। আর তার সংগে থাকে আবেগ।
এ রকম আবেগে ভরপুর হয়ে গেছে চাঁদ। দুজন আর ঠিকমত ক্লাস করে না, চলে যায়
তুষারের বন্ধুর স্টুডিওতে গল্প করার জন্য। আর পার্কে যদি সন্ধ্যা হয়ে যায়
তাহলেতাে আর কেউ তেমন দেখতে পায় না। লিপিস্টিকের দাগ পরে তুষারের বিভিন্ন
জায়গায়। আর হাত সে তাে চলেই তার নিজের গতিতে।
আর এদিকে মােবাইলে চাঁদ
বলে, আর ভাল লাগছে না। তুমি এসাে তােমাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। হায়রে
মেয়ে মানুষ ! এদেরকে কি দিয়ে তৈরী করা তা আল্লাহই ভাল জানেন।
আজ তুষার আর
চাঁদ গিয়েছে নদীর পরে।
-চাঁদ আবেগের ভঙ্গিতে বলল, জান্ আর ভাল লাগছে না
তুমি আমাকে বিয়ে করবে কবে? আর না হয় চলাে আমরা দূরে কোথাও চলে যাই,
যেখানে আমাদের কেউ চিনবে না। আমরা বিয়ে করবাে, ছােট্ট একটা সংসার হবে। সেই
সংসারে থাকবে শুধু সুখ আর সুখ। আমাদের কাছে আসবে নতুন মানুষ। চলাে না
আজকেই যাই।
-তুমি এ সমস্ত কথা আবেগের তাড়নায় বলছ। এতে কোন সুখ নেই। বাবা,
মাকে কষ্ট দিয়ে কিছু করলে কখনও সুখি হওয়া যায় না। আর আবেগ! সেতাে ভয়ংকর
এক জিনিস। আবেগ শুধু ক্ষতিই করতে পারে, কোন লাভ সে দিতে পারে না। এই আবেগই
শেষ করে দিয়েছিল ট্রেয় নগরীকে।
-চাঁদ একটু অবাক হয়ে, ট্রোয় নগরীকে শেষ
করে দিয়েছিল মানে বুঝলাম না।
-অনেক সময় লাগবে এত বলার সময় নেই আর একদিন বলব
চল আজ উঠি।
-ঠিক আছে চলাে।
রাতে ফোন করেছে মেহেদী (তুষার)
-হ্যালাে কি
ব্যাপার কি করছাে ?
-কিছু না বসে আছি।
-ক্লাস করেছে আজকে ?
-জি করেছি ?
-আজ
কয়টা ক্লাস হয়েছে ?
-তিন টা।
এমন
ভাবে বলছে যার মধ্যে মিথ্যের কোন ছাপ নেই চাঁদের। মেয়েদের অভিনয় বােঝা
বড় মুশকিল। কথা বলতে বলতে চাঁদ বলল, আমাদের বিয়ের কথা তােমার বাবাকে বলবে
কবে ?
-এই তাে বাবার ব্যবসাটা হাতে নিয়েই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তােমাদের
বাসায় যাব।
চাঁদের এই সমস্ত কথা শুনে কষ্টে বুকটা ফেটে যায়, এমন ভাবে বলে
মনে হয় আমিই সব, আবার ক্লাসে এমন ভাবে বলে, মনে হয় আমিই সব। যদি ক্লাসের
ছেলেটা আরেকজন হতাে।
-তুষার বলল, আজ মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে, আজকে বেশী কথা
বলতে পারবাে না।
-ঠিক আছে ঘুমাও।
-বাই, গুড নাইট।
মাথা ব্যথা করছে প্রচণ্ড
কিন্তু ঘুম চোখে আসছে না। জীবনে একটা মেয়েকেই মন দিলাম, মেয়েটা এমন।
কিভাবে জীবন সঙ্গী করি তাকে। চেহারা সুন্দর হলেই কি হয়। চরিত্রই তাে
মেয়েদের আসল সম্পদ। চেহারা দিয়ে কি করবাে ? বিয়ের পর যদি কারাে সংগে
পরকীয়া করে। যতটা সুখের জন্য বিয়ে করবাে তখন ঠিক ততটায় দুঃখ সইতে হবে
আমাকে।
পরের দিন আবার ক্লাস ফাঁকি, বসে আছে এক গাছ তলায়।
-চাঁদ বলল, আচ্ছা
তােমার কি কোন বন্ধু ছাত্রাবাসে থাকে ?
- হ্যা আছে কেন ? তাই বলছিলাম, এ
রকম বাইরে বাইরে গল্প না করে ওখানে বসে ভাল ভাবে গল্প করা যেতাে।
তুষারের
বুঝতে বাকি রইল না, চাঁদের আকাঙ্খ। আচ্ছা ঠিক আছে দেখি কি করা যায় ।
-
চাঁদ নেশা নেশা চোখে তুষারের হাত ধরে বলল, ওকে একটু ম্যানেজ কর প্লিজ।
-বললাম, আচ্ছা আজকে বাসায় যাবার সময় তার সাথে দেখা করে যাব।
-যে ভাবেই হােক
ঠিক করবে কিন্তু, কালকে ক্লাসে যাব না। সােজা তােমার ঐ বন্ধুর মেসে যাবাে।
-ঠিক কাল এখানে আসবে এখান থেকে তােমাকে নিয়ে যাব।
-ওকে বাই।
-তুষার বলল, হ্যালাে কিরে দোস্ত কেমন আছিস ?
-এই তাে
ভালাে, এতাে দিন পর আমার কথা মনে পরলাে। অবশ্যই তাের কোন প্রয়ােজন আছে।
বল কি করতে পারি তাের জন্যে ?
-দোস্ত আমার এটা উপকার করতে হবে।
- কি
তাড়াতাড়ি বলে ফেল। আমার সাদ্ধের ভিতরে থাকলে অবশ্যই করে দিব।
-তাের রুমটা
আমার কিছুক্ষণের জন্য দরকার, দিতে পারবি ?
-সব বুঝতে পেরেছি। এটাতাে ছিম্পল
ব্যাপার। তাে কাল কখন আসবি তােরা ?
-এই তাে সকাল দশটায় ।
-নাে প্রবলেম আমি
ক্লাসে যাব তুই জমিয়ে যা করার করিস।
-আচ্ছা রাখি, কাল দেখা হবে বাই।
রাতে
কল
-হ্যালাে, জানু কি করছাে?
- চাঁদ কেমন করে যেন বলল, না কিছু না।
- তােমার
আম্মু কি করছে ?
-ঐ ঘরে কি যেন করছে। ও শােন একটা কথা কাল আমি এক যায়গায়
বেড়াতে যাব আমার ফ্যামেলির সংগে। তুমি সকাল ১০ টা থেকে বিকাল পর্যন্ত কল
করবে না।
-দিনের বেলা আমিতাে সাধারণত তােমার কাছে কল করি না, হঠাৎ একথা বললে
কেন বুঝলাম না।
-না মানে এমনি বললাম কাল একটু ব্যস্ত থাকবাে তাে তাই।
- আচ্ছা
ঠিক আছে। তাহলে এখনি ঘুমাও।
-কেন এখনই ঘুমাতে বলছাে কেন ?
-না কাল তুমি ব্যস্ত
থাকবে তাে তাই বললাম।
-ও তাই বল ঠিক আছে ঘুমাও। আচ্ছা বাই।
-বাই।
পরের দিন
সকাল ১০টায় দু'জন হাজির ঐ বন্ধুর কাছে। গিয়ে দেখে বন্ধু বসে আছে ঘরে।
চলবে............


কোন মন্তব্য নেই