Header Ads

লাভ (উপন্যাস) পর্ব- ৬


লাভ
                
              এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন

               উপন্যাস পর্ব-৬

অনেক কয়েক দিন হলো হৃদয় বাবু নিয়মিত ক্লাস করছে। আজ কলেজে এসে হৃদয় বাবুকে বললাে, অনেক দিন হল আতিককে দেখছি না ।

Love


-বাবু মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাে, তুই ঠিকই বলেছিস অনেক কয়েক দিন হলাে সে কলেজে আসছে না। চল ওর বাড়ি গিয়ে ওকে দেখে আসি । শরীর খারাপ হতে পারে। বাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাে, নেই। ওর বাড়ি যেতে আবার নদী পার হতে হয় ।

হৃদয় বললাে, এইতাে নদী, বেশী সময় লাগবে না যাব আর আসবাে।

ঠিক আছে চল।

এই বলে ওরা দু’জন আতিকের বাড়িতে গেলো। কলেজের এক বট গাছের নিচে শান্তিও তার বান্ধবীদের সাথে গল্প করছে।

-শান্তি তার বান্ধবীদের বললাে চল আমরা আজ একজনের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।

যুক্তা বললাে কার বাড়ি?

-মৌসুমীদের বাড়ি, অনেক দিন হলাে মৌসুমী কলেজে আসছে না।

আতিকের বাড়ির পাশেই মৌসুমীর বাড়ি। আতিক ও মৌসুমী দুজন দুজনকে ভালবাসে। তাদের ভালবাসার কথা দু’জনের বাবা মা'ই জানে। আতিক খুব অসুস্থ তাই মৌসুমীও তার জন্য ক’দিন কলেজে আসছে না। হৃদয় ও বাবু আতিকের অসুস্থতা দেখে আসছে। আর শান্তি ও তার বান্ধবীরা মৌসুমীর কাছ থেকে সব কিছু শুনে কলেজে আসছে। কলেজে আসতে নদী পার হওয়ার সময় একই নৌকায় ওরা সবাই উঠেছে। হৃদয় ও বাবু নৌকার এক কোণে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। আর শান্তিরা নৌকার আর এক কোণে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কিছুক্ষণ পর শান্তি নৌকার মাথায় গিয়ে বসলাে। যুক্তা বললাে, নৌকার মাথায় বসি না হঠাৎ পড়ে যাবি।

-শান্তি হাসতে হাসতে বললাে আমি পড়বাে না। এই বলে শান্তি নিচু হয়ে পানিতে হাত দিতেই একেবারে পড়ে গেল। শান্তি সাঁতার জানে না। বাঁচাও বাঁচাও বলছে। বান্ধবীরা কেউ সাঁতার জানে না। তাই কেউ নামছে না । হৃদয় একবার অন্য দিকে মুখ ফিরালাে। মনে হয় হৃদয় জানেই না কি ঘটনা ঘটেছে।

-বাবু দেখে অবাক হয়ে বললাে, দেখ হৃদয় শান্তি পানিতে পড়ে গেছে।

-শান্তি পড়েছে তা আমার কি?

- শান্তি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে ।

-যুক্তা হৃদয় এর কাছে গিয়ে অনুরােধ করে বললাে, হৃদয় ভাই শান্তিকে বাঁচান, ও ডুবে যাচ্ছে ।

-বাবু বললাে, যা হৃদয় আমিও তােকে অনুরােধ করছি।

হৃদয় আর দেরী না করে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে শান্তিকে তুলে নিয়ে এলাে। শান্তির এখনাে জ্ঞান ফিরেনি- হৃদয় বান্ধবীদের খুব অনুরােধ করে বললাে, আমি বাঁচিয়েছি কক্ষণও ওকে তােমরা বলবে না ।

যুক্তা বললাে, শান্তির জ্ঞান ফিরলে অবশ্যই জানতে চাইবে কে তাকে বাঁচিয়েছে।

-হৃদয় বললাে সেই ব্যবস্থা আমি করছি।

১৫/১৬ বছর বয়সী ছেলে এই নৌকার মাঝি । হৃদয় তাকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে বললাে ও জানতে চাইলে বলবে এই ছেলে বাঁচিয়েছে।

-যুক্তা মন খারাপ করে বললাে, আপনি যখন এতাে অনুরােধ করছেন। ঠিক আছে তাই বলবাে। শান্তির জ্ঞান ফিরলাে, উঠেই জানতে চাইলাে কে তাকে বাঁচিয়েছে, এই বলতেই শান্তি দেখতে পেলাে ডান পাশে ভেজা গায়ে ছেলেটি দাড়িয়ে আছে। ছেলেটিকে কিভাবে ধন্যবাদ দিবে শান্তি তা খুজে পেলাে না। ছেলেটিকে বললাে তুমি নৌকা চালিয়ে কত টাকা মাসে আয় কর?

-ছেলেটি বললাে হয় দেড়, দুই হাজার টাকা।

-শান্তি বললাে প্রতি মাসে ১ তারিখে আমার বাড়ি যাবে আমি তােমাকে ৩০০০ হাজার টাকা করে দিবাে।

ছেলেটি ভাবলাে, মিথ্যাভাবে আমি টাকা নিতে পারবাে না, তাই বললাে আপনাকে টাকা দিতে হবে না। যদি কোন দিন আমার বিপদ হয় তাহলে আপনাকে জানাবাে।

-শান্তি খুশি হয়ে বললাে, তােমার বাবা সত্যিই আদর্শ পিতা। কলেজে এসে শান্তি হৃদয়কে সার্ট পরা দেখতে পেলাে । দেখে শান্তি যুক্তাকে বললাে, দেখ ঐ ছােকরা কলেজে এসে সার্ট খুলে মানুষকে তার বডি দেখাচ্ছে। কৃষকের ছেলে। হয়ে এত ভাব । তাহলে ধনীর ছেলে হলে কি করতাে তা আল্লাই জানে। বান্ধবীরা শান্তির কথা শুনে কোন কথা বললাে না। সবাই চুপ করে আছে।

-শান্তি তার বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললাে, কিরে তােরা কেউ কথা বলছিস না যে, তােদর মুখ দেখে মনে হচ্ছে তােরা সবাই হৃদয়ের পক্ষে।

-যুক্ত বললাে, হৃদয়ের পক্ষে হব কেন, আমরা তার পক্ষেই কিন্তু হৃদয় খুব ভাল ছেলে।

-শান্তি অহংকারে বললাে, কত ভাল ছেলে দেখলাম ।

-যুক্তা রাগ করে বললাে, অহংকার মানুষকে অনেক নিচে নেমে দেয় । কথাটা মনে রাখিস । এই বলে যুক্তা শান্তির সাথে আর কথা বললাে না।

ক্লাস হচ্ছে, হৃদয় বাবু এক সাথে আর শান্তি ও যুক্তা এক সাথে বসে ক্লাস করছে। স্যার ক্লাস করাতে করাতে ছাত্র-ছাত্রীদের লক্ষ্য করে বলল, আচ্ছা বলত Candor শব্দের অর্থ কি? যে যে পারৰে হাত তুলে দাঁড়াবে। হৃদয় একাই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ দাঁড়াতে পারেনি ।

-স্যার বললাে কি ব্যাপার তােমরা কেউ পারবে না । হৃদয় বল এর অর্থ কি? -হৃদয় উত্তরে বললাে, ইহা দক্ষিণ আমেরিকার এক শ্রেণীর বড় শকুন । এই শব্দটি Students Favorite Dictionary- ২৯০ পৃষ্ঠার প্রথম কলামে আছে।

-ছাত্র-ছাত্রীরা শুনে সবাই অবাক। যুক্তা শান্তিকে বললাে দেখেছিস হৃদয় ভাই আসলেই ভাল ছাত্র । দেখবি সে ভবিষ্যতে অনেক বড় হবে।

-শান্তি বললাে, কি আর করবে বাবার সাথে জমি চাষ করবে।

-স্যার হৃদয়ের উত্তর শুনে ভীষণ খুশি হয়ে বললাে, হৃদয় তুমি সত্যিই বেনী ছাত্র। আমি দোয়া করি তুমি যেন ভবিষ্যতে অনেক বড় হতে পার।

-হৃদয় হাসি মুখে বসলাে, কাল কলেজে ক্রিকেট খেলা ।

-বাবু হৃদয়কে বললাে, কাল খেলা আছে তুই খেলবিনা? না আর খেলতে মন চায় না।

-বাবু বললাে, একবার খেল তুই খেলা পারিস কলেজের ছাত্রদের দেখা।

-ঠিক আছে তুই যখন বলছিস খেলবাে।

-ক্লাস করে দুজন বাড়ি এসে মিসেস শবনমকে হৃদয় হাসতে হাসতে বললাে, খালাআম্মা আজ ক্লাসে স্যার আমার জন্য দোয়া করেছে।

-খালাআম্মা বললাে, আমারও আত্মবিশ্বাস তুমি অনেক বড় হতে পারবে।

-সত্যি বলছেন, হে আল্লাহ তুমি খালাআম্মার দোয়া কবুল করিও।

পরের দিন ক্রিকেট খেলা । হৃদয়ের খেলা দেখে সবাই হতবম্ব। হৃদয় সকলের চেয়ে অসাধারণ খেলা খেলেছে। তার দল জয়ী হয়েছে একমাত্র তার জন্যই। স্যার তার খেলা দেখে বলছে সে শুধু ভাল ছাত্রই নয়, খুব ভাল খেলতেও পারে। সব দিক দিয়ে সে স্কয়ার ।

-কলেজের সকল ছাত্রী হৃদয়ের খেলা দেখে মুগ্ধ। যুক্তা শান্তিকে বললাে, বলেছিলাম না হৃদয় সাধারণ ছেলে নয় ।

-শান্তি রেগে বললাে, ঐ কৃষকের কথা আমাকে আর কোন দিন বলবি না।

-হৃদয় একটি উপন্যাস লিখেছে কাউকে বলেনি। হৃদয় কোনদিন উপন্যাস লিখেনি এই উপন্যাসই তার প্রথম । সে আজ রাতে খাওয়ার সময় আব্দুর রব। সাহেবকে বললাে, খালু আমি একটা উপন্যাস বের করতে চাই টাকার প্রয়ােজন।

-তুমি উপন্যাস লিখেছ এতো খুশির খবর যত টাকা লাগে আমি দিব ।

-হৃদয় ভীষণ আনন্দিত হয়ে হাসতে হাসতে বললাে, সত্যিই আপনি আমার বাবার মত। এতদিন থাকলাম একদিনও আপনি আমাদের আশা অপূর্ণ রাখেননি।

-আব্দুর রব সাহেব বললাে, তােমার উপন্যাসটি আজকে দিবে আজ রাতে আমি পড়বাে।

-হৃদয় বললাে অবশ্যই পড়বেন। আমি এখনি এনে দিচ্ছি ।

-হৃদয় উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি এনে দিল ।

-খালু হাতে নিয়ে বললাে, কি ব্যাপার এই উপন্যাসের নাম লেখনি যে । কি নাম রেখেছ?

-হৃদয় বললাে, “হৃদয়ের শান্তি

-খুব সুন্দর নাম হয়েছে।

-আব্দুর রব সাহেব উপন্যাসটি পড়ে কোন কথা না বলে পরের দিনই ছাপাতে নিয়ে গেছে।

-হৃদয় পরের দিন বললাে, খালু উপন্যাসটি পড়ে কেমন লাগলাে। ছাপানাে যাবে তাে? না আপনি পড়ে খারাপ লেগেছে বলে পুড়ে ফেলে দিয়েছেন?

-খালু বললাে, আর পাঁচ দিন পর লাইব্রেরীতে খােজ করে দেখাে তােমার উপন্যাস পাও কিনা-

-তার মানে আপনি আমার উপন্যাস ছাপাতে দিয়েছেন।

-হ্যা আজকেই ছাপাতে দিয়েছি। আমার বিশ্বাস তােমার উপন্যাস বাজারে নাম করবে।

-দোয়া করবেন তাই যেন হয় ।

-পাঁচ দিন পরে শান্তি একা ঘরে শুয়ে শুয়ে জনকণ্ঠ পেপার পড়ছে। পেপারের এক কোনায় লেখা আছে, বের হয়েছে বের হয়েছে, প্রতিভাবন কথা সাহিত্যিক মােঃ মহাতাব উদ্দিনের ঝড় তােলা উপন্যাস 'হৃদয়ের শান্তি’ এখন পাওয়া যাচ্ছে ঢাকা বিভাগের প্রতিটি জেলার বুক ষ্টল গুলােতে।

হৃদয়ের ভাল নাম মহাতাব উদ্দিন। কেউ তা জানে না। শান্তি পেপার পড়ে । লাইব্রেরী থেকে উপন্যাসটি কিনে নিয়ে এলাে। এই উপন্যাসটি শান্তির মন জয় করেছে। এতাে সুন্দর উপন্যাস শান্তি তার জীবনে কোনদিন পড়েনি। শান্তি এই উপন্যাস লেখককে খুঁজতে লাগলো। কে এই লেখক? এত সুন্দর করে উপন্যাস সে কিভাবে লিখলাে। ১০/১২ দিনের মধ্যে হৃদয়ের নাম সবার মুখে মুখে। হৃদয় কলেজে এসে দেখে অনেকের হাতে তার লেখা উপন্যাস । কলেজে যে ছাত্রের কাছে যায় তার মুখেই শুনে হৃদয়ের লেখা উপন্যাসের কথা । কলেজের কোন ছাত্রই জানেনা হৃদয়ের নামই মহাতাব উদ্দিন । ক্লাসে স্যার লেকচার দেওয়ার সময় বললাে, এখন বাজরে মহাতাব উদ্দিন এর হৃদয়ের শান্তি' নামে একটি উপন্যাস বের হয়েছে। তােমরা সকলেই পড়বে। খুব সুন্দর উপন্যাস, হৃদয় ভাবতেই পারেনি তার এই উপন্যাস পাঠ করে এতাে ভাল লাগবে। হৃদয় স্যারের সঙ্গে ঠাট্টার সঙ্গে হাসতে হাসতে বললাে, স্যার এই লেখক কে আপনি চেনেন?

-স্যার বললাে, না, চিনলে তার সঙ্গেই আগে দেখা করতাম ।

-শান্তি দাঁড়িয়ে বললাে, এই উপন্যাসটি আমারও খুব ভাল লেগেছে। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয় মুখ ব্যজার করে বসে পড়ল। স্যার এদৃশ্যটি লক্ষ করে কিছুই বুঝতে পারল না। তবে চিন্তা করতে লাগলাে কেন হৃদয় শান্তির কথায় রাগ করে বসে পড়ল। ক্লাস শেষে শান্তি যুক্তাকে বললাে, লেখক কে আমি অবশ্যই খুঁজে বের করবো। এই লেখককে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

শান্তি বিভিন্ন লাইব্রেরীতে খোঁজ করেছে। তারা বলে এই উপন্যাস বাজারে খুব চলেছে। শান্তিকে এই লেখক পাগল করে ফেলেছে। শান্তি সব সময় লেখকের কথাই ভাবে।

স্যার কথাটি ভাবতে ভাবতে ধরে ফেললাে। তার ক্লাসে হৃদয়ের নামই উপন্যাস লেখক মহাতাব উদ্দিন। পরের দিন ক্লাসে স্যার হৃদয়কে ডেকে বললাে, আচ্ছা তােমার ভাল নাম কি?

-কেন স্যার। আজ কি মনে করে আমার ভাল নাম জিজ্ঞাসা করছেন?

-আজ হাজিরা খাতায় দেখলাম তােমার নাম মহাতাব উদ্দিন। তুমিই তাহলে উপন্যাস লিখেছাে?

-হৃদয় হাসতে হাসতে বললো, জি স্যার আমি লিখেছি ।

-কিন্তু কেন বলনি। 

-আমি মনে করেছিলাম উপন্যাসটি ভাল হবে না তাই।

ক্লাস শেষে হৃদয়, বাবু বাড়ি এলাে। শান্তি স্যারকে বললাে, স্যার এই উপন্যাস লেখকের ঠিকানা পেলে দয়া করে আমাকে জানাবেন। আমি একটু তার সাথে দেখা করব।

-স্যার বললাে, এই লেখককে আমি চিনি এর বাড়ির ঠিকানাও জানি। এই ছেলে এখনও আমার ছাত্র।

-শান্তি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললাে, সত্যি বলছেন স্যার?

-আমি তােমার সঙ্গে মিথ্যা বলবাে কেন?

-তাহলে তাড়াতাড়ি বলুন। আজই তার বাড়ি গিয়ে দেখা করবাে।

-সে তােমাদের ক্লাসেই পড়ে।

-তাই নাকি। উপন্যাস লিখার পর মনে হয় একদিনও ক্লাসে আসেনি প্রত্যেক দিন ক্লাসে আসে। কিন্তু কাউকে তার আসল নাম জানায়নি।

-শান্তি হাসতে হাসতে বললাে, ছেলেটি সত্যিই মহৎ। আমাকে তার বাড়ির ঠিকানা দিন। এক্ষুনি ঐ মহৎ লােকের সঙ্গে দেখা করে আসবাে।

-স্যার বললাে, আমার বাড়ি যেতে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে হয়। চল। রিক্সায় যেতে যেতে তােমাকে ওদের বাড়ির সামনে নেমে দিয়ে আমি চলে যাব।

-শান্তি বললাে, মাইক্রো নিয়ে এসেছি। আমাকে ওদের বাড়ি চিনে দিন। আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করব।

-স্যার বললাে, ঠিক আছে চল ।

চলবে................

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.