Header Ads

লাভ (উপন্যাস) পর্ব-৫


লাভ
                    
                 এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন

উপন্যাস-(পর্ব-৫)

হৃদয় ও বাবু এখন ঢাকায়। প্রথম কয়েকদিন মন্ত্রী সাহেব বাসায় আছে ওরা দু’জন। পরে রুম ভাড়া নিবে।

মাননীয় মন্ত্রী হৃদয় ও বাবুর জন্য দুই রুম দিয়েছে। প্রতি রাতে হৃদয় ও বাবুর সঙ্গে মন্ত্রী সাহেব আলাপ আলােচনা করেন। আজ তারা আলােচনা করছে।

Love


হৃদয়কে মাননীয় মন্ত্রী বললেন, তােমরা আমাদের বাড়ীতে থাকবে। আর সামনে রাস্তার পাশে যে মাঠ আছে সেই মাঠে ক্রিকেট খেলবে। বড় দলের সঙ্গে তােমাদের আমি পরিচয় করিয়ে দিব। এমন কি তােমরা যদি ভালাে খেলতে পারো তাহলে তােমাদের জাতীয় দলে চান্স পেয়ে দিব। যত খরচ আমার। কোন বিপদ বা টাকার প্রয়ােজন হলে আমাকে বলবে।

-হৃদয় বললাে, সবে মাত্র আমরা H.S.C পরীক্ষা দিলাম। আমরা এখনই লেখাপড়া বাদ দিয়ে ক্রিকেট খেলায় সময় কাটাতে চাইনা।

-মাননীয় মন্ত্রী বললেন, ঠিক আছে তােমরা লেখাপড়া কর কিন্তু ক্রিকেট সব সময় পাশে রাখবে। অবসর সময় পেলে ক্রিকেট অনুশীলন করবে। আর তােমাদের এই ঢাকায় থাকতে যত টাকা খরচ হবে সব আমার। তােমাদের। কোন চিন্তা করতে হবে না। যেখানে দেখবে ক্রিকেট খেলা সেখানে অংশ নিবে।

-কিছুক্ষণ পরে মাননীয় মন্ত্রী তাদেরকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে বললাে, এই টাকা রাখাে তােমাদের প্রয়ােজন হতে পারে। হৃদয় বললাে আমাদের এখন টাকার প্রয়ােজন নেই। টাকা প্রয়ােজন হলে আপনার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিব। আগামী কাল থেকে আমরা একটা ছাত্রাবাস খোজ করবাে ।

-মন্ত্রী সাহেব বললেন, কেন, অসুবিধা কি? আমার বাসায় তােমরা থাকবে।

-না আমরা ছাত্রাবাসেই থাকবাে, ওখানে থেকেই আমরা ভাল লেখা পড়া। করতে পারবাে।

-মন্ত্রী সাহেব বললাে, ঠিক আছে আমি তােমাদেক ঠিকানা দিচ্ছি সেই ঠিকানায় যাবে দেখবে তাদের নিচ তলার একটি রুম ফাঁকা আছে। সে আমার বন্ধু হয়। সেখানে গিয়ে আমার নাম বললেই হবে। আর কিছুই করতে হবে না। লােকটির নাম আঃ রব।

পরদিন সকালে হৃদয় ও বাবু ঠিকানা অনুযায়ী বাড়িতে গেল । আব্দুর রব সাহেব তাদেরকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়ে একসাথে ড্রইং রুমে বসে বললেন, তােমরা এখানে থাকতে এসেছাে আমি জানি। মন্ত্রী সাহেব আমাকে গতকাল রাতে ফোন করেছিল। আমার নিচ তলায় একটি ঘর ফাঁকা আছে। তােমাদের যখন ইচ্ছা আসতে পার ।

-হৃদয় বললাে, আমরা তাহলে আজকেই আসতে চাই, তবে আপনার যদি আপত্তি থাকে তাহলে দু'দিন পর আসব ।

-আব্দুর রব সাহেব মুচকি হাসতে হাসতে বললেন, কোন অসুবিধা নেই আজকেই আসতে পার। তারা আজকেই চলে এলাে, আব্দুর রব সাহেবের বাসায়।

দুদিন পর মন্ত্রী সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সেই রাতেই ইন্তেকাল করেন। দুঃখের সহিত হৃদয় বাবুকে বললাে, মন্ত্রী সাহেব খুব ভাল লােক ছিলেন। বাবু বললাে, সত্যিই । ভাল লােক বেশি দিন বাঁচে না। উনি তােকে ক্রিকেট খেলার জন্যই এনেছে আর কিছুই হল না।

-হৃদয় মন খারাপ করে বললাে, যাহ্ আর ক্রিকেট খেলব না। ঢাকায় যখন এসেছি এখানেই লেখাপড়া করবাে।

এখন হৃদয় ও বাবু ঢাকা কলেজের ছাত্র । ক্লাস এখনও শুরু হয়নি। ক্লাস শুরু হতে আর তিন দিন বাকি।

বাবু হৃদয়কে ঘুম থেকে ডেকে বললাে, এই হৃদয় এত ঘুমালে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে। আমরা ঢাকা শহর ঠিক মত চিনি না। চল এই দুই তিন দিন আমরা ঢাকা শহর ঘুরে ফিরে কাটায় ।

-হৃদয় চোখ মুছতে মুছতে বিছানা থেকে উঠে বললাে, ঠিক আছে চল । দুজন গােসল, খাওয়া-দাওয়া করে বের হলাে ঢাকা শহর ঘুরতে । তিন দিন অনেক ফুর্তি করে দিন কাটালাে। আগামীকাল থেকে ক্লাস শুরু।

আব্দুর রব সাহেব খুব ভাল লােক এবং একজন ভাল উকিল । কিন্তু দুঃখের বিষয় তার কোন সন্তান নেই । হৃদয় ও বাবুকে দেখে উকিল সাহেবের খুব পছন্দ হয়েছে। তাই আজ রাতে খাওয়ানের জন্য হৃদয় ও বাবুকে আব্দুর রব সাহেব ডেকেছে।

-হৃদয় বাবুকে বললাে চল, উকিল সাহেব কি বলে আমরা শুনে আসি।

-বাবু মুখ উল্টিয়ে বললাে, আমার মনে হয় আমাদের এখানে রাখবে না।

-হৃদয় বললাে, কেন আমরা তাে কোন খারাপ কাজ করিনি যে আমাদের তাড়িয়ে দিবে।

-বাবু বললাে, হয়তাে বা ওনার চোখে আমাদের খারাপ লাগছে ।

-হৃদয় বললাে, না জেনে শুনে কোন কিছু ধারণা করা ঠিক নয়। চল আগে শুনে আসি উকিল সাহেব আমাদের কি বলে।

-বাবু বললাে, ঠিক আছে চল। হৃদয় ও বাবু উপরে গিয়ে দরজায় নক করলাে। আব্দুর রব সাহেব দোতলায় থাকেন। রব সাহেবের স্ত্রী দরজা খুললে হৃদয় সালাম দিলাে, সালামের জবাব দিয়ে তিনি তাদের বসতে দিলেন । রব সাহেবের স্ত্রীর নাম মিসেস শবনম । রব সাহেব আসতেই হৃদয় সালাম দিয়ে দাঁড়ালাে। রব সাহেব সালামের উত্তর দিয়ে বললেন চলাে আমরা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে খাওয়া দাওয়া করতে করতে গল্প করবাে।

হৃদয়, বাবু ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দেখে সমস্ত খাবার রেডী করা আছে। তারা তিনজন বসলাে। হৃদয় মিসেস শবনমকে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে বললাে আন্টি আপনি আমাদের সঙ্গে বসেন।

-মিসেস শবনম মুচকি হাসতে হাসতে বললাে, আমি তােমাদের সঙ্গে খেতে বসলে তােমাদের খাওয়াবে কে?

-হৃদয় বললাে, আপনাকে খাওয়াতে হবে না আমরা নিজেরাই তুলে নিয়ে খেতে পারবাে।

-রব সাহেব, শবনমকে বললাে, তুমি বসাে। খেতে খেতে রব সাহেব হৃদয় ও বাবুকে বললেন, তােমাদের কাছে আমার একটা জিনিস চাই বল দিবে?

-হৃদয় আনন্দ স্বরে আশ্চর্য হয়ে বললাে আমার বাবা কৃষক, আমরা গরিব, আপনাকে দিব এমন কিছু আমাদের নেই।

-রব সাহেব বললাে, তােমাদের কাছে যা আছে আমাদের কাছে নেই ।

-ওরা দু’জন আরাে আশ্চর্য হয়ে বললাে, আমাদের কাছে যা আছে আপনাদের কাছে নেই এটা আবার কেমন জিনিস?

-রব সাহেব বললেন, আগে বলাে দিবে কিনা?

-হৃদয় বললাে, দিব না মানে, আপনাকে দেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবাে।

-রব সাহেব খুশি হয়ে বললেন তাহলে বলি শােনাে। আমাদের কোন সন্তান নেই। তাই তােমাদের আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তােমরা যদি আমাদের কাছে ছেলের মত থাক তাহলে আমরা যথেষ্ট খুশি হব।

-হৃদয় হাসতে হাসতে বললাে, আমরা তাে আপনার সন্তানের মতই।

-রব সাহেব বললেন ওভাবে নয় তােমাদের এই ঢাকায় যত খরচ হবে আমি দিব, তােমরা আমাদের সঙ্গে খাবে। আমাদের এখানে অনেক রুম আছে কিন্তু থাকার মানুষ নেই। তােমরা আমাদের সঙ্গে থাকবে এটা আমরা চাই। বাবার কাছে সন্তান যেমন থাকে ঠিক তেমনিভাবে তােমাদেরকে আমরা রাখতে চাই।

-হৃদয় মুচকি হাসতে হাসতে বললাে, থাকতে পারি এক শর্তে ।

-উকিল সাহেব বললেন, কি শর্ত বলো?

-হৃদয় বললাে, আমাদেরকে একটি জিনিস দিতে হবে ।

-কি দিতে হবে? হৃদয় বললাে, পিতা মাতা সন্তানকে যেমন ভালবাসেন, তেমন ভালবাসতে

-রব সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, তােমরা আগে উপরে আসাে তাহলেই বুঝতে পারবে ভালবাসার পরিমাণ। গল্প করতে করতে কখন যে খাওয়া দাওয়া শেষ হয়েছে তারা নিজেই বলতে পারে না।

-হৃদয় চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে বললাে, আজ তাহলে আমরা আসি । রব সাহেব বললেন, কালকেই এসো।

-হৃদয় বললাে, ঠিক আছে আংকেল কাল আপনাদের সন্তান হয়ে আসবাে। এই বলে হৃদয় ও বাবু নিচে নেমে এলাে । মিসেস শবনম উকিল সাহেবকে বললাে, ভালই হলাে দু’জন সােনার টুকরাে ছেলে পেলাম।

-হৃদয় বাবুকে ঘুমানাের সময় শুয়ে শুয়ে বললাে, কাল আমাদের প্রথম ক্লাশ! কি যে হয় আল্লাহপাকই ভাল জানে।

-বাবু বললাে, কি আর হবে, ক্লাস হবে ।

-গল্প করতে করতে দু’জন ঘুমের ঘােরে বিভাের হয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে গােসল, খাওয়া সেরে প্যান্ট সার্ট পরে ভদ্রলােকের মত দু'জন কলেজের দিকে রওনা হলাে । দু’জন ক্লাস শুরু হওয়ার আধ ঘন্টা আগে গিয়ে কলেজের ভিতরে এবং আশে পাশে কেমন তা দেখতে খুব সুন্দর বিরাট লম্বা তিন তলা কলেজ। কলেজের সামনে একটা মাঠ ও বাগান আছে, একটা ছােট পুকুর আছে। দেখতে অনেকটা পার্কের মত। অনেক ছেলে মেয়েরা ক্লাসে আসছে।

-হৃদয় কলেজের ছাত্রীদের দেখে বাবুকে বললো, দোস্ত এখানকার মেয়েদের দেখে মনে হচ্ছে বগুড়ার মেয়েদের চেয়ে এখানকার মেয়েদের লজ্জ্বা একটু কম।

-হৃদয় কিছুক্ষণ পর আর একটু অবাক হয়ে বললাে, দেখ কোন কোন মেয়েরা। সার্ট প্যান্ট পরে ক্লাস করতে এসেছে। কেউ আবার স্কিন প্যান্ট পরা দেখে মনে হচ্ছে এরা বাঙ্গালী মেয়েই নয় ।

-বাবু বললাে, তুই ঠিক বলেছিস।

- তার একটা গাছের নিচে বসে এই সব গল্প করছে। কিছুক্ষণ পর বাবু অবাক হয়ে হৃদয়কে ডেকে বললাে, এই হৃদয় দেখ একটা মাইক্রো ভিতরে ঢুকছে মনে হচ্ছে গাড়িতে কেউ নেই একটা মেয়ে গাড়ি চালিয়ে আসছে। কাছে। আসলে তারা স্পষ্ট দেখতে পেল যে একটি মেয়ে। মেয়েটিকে দেখে হৃদয় হতভম্ব হয়ে গেলাে। হৃদয় গাছের নিচ থেকে দাড়িয়ে শুধু সেই মাইক্রোচালক মেয়েটিকেই দেখতে লাগলো। মেয়েটি মাইক্রো থামিয়ে । খুব ভাব নিয়ে ক্লাসের দিকে গেলাে, হৃদয় সেই মেয়েটিকে দেখে আর কথাই বলতে পারছে না। বাবু হৃদয়কে ধাক্কা দিয়ে বললাে, কিরে ওভাবে কি দেখছিস?

-পরীকে দেখছি।

-এখানে আবার পরী এলাে কোথা থেকে। সব তাে মানুষ।

-এতাে সুন্দর মেয়ে আমার জীবনে কোন দিন দেখিনি। আজই প্রথম

-বাবু বললাে, কোন মেয়ের কথা বলছিস?

ঐ মাইক্রো থেকে নেমে যে মেয়েটি গেলাে। সেই মেয়ে ।

-বাবু বললাে, ঐ মেয়েকে তাহলে তাের খুব পছন্দ হয়েছে।

-হয়েছে মানে, আজি ঠিকানা নিয়ে আমি ঐ মেয়ের বাড়িতে যাব।

-বাড়িতে গিয়ে কি করবি?

-কি করবাে আবার ভালবাসার প্রস্তাব দিব ।

-বাবু বললাে, দেখে তাে মনে হচ্ছে অনেক ধনী লােকের মেয়ে। তুই গেলে তােকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিবে।

-কেন? ভালবাসার আবার ধনী গরীব কি?

-ঠিক আছে যা তাের ভালবাসা কি বলে । দেখি ।

-হৃদয় বাবুর হাত ধরে বললাে, বন্ধু আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।

-বাবু বললাে, একটা কাজ কেন ১০০টা কাজ করে দিব । এতাে দিন পর আমার বন্ধু পছন্দ করেছে এটা আমার আনন্দের কথা।

-হৃদয় বললাে, ঐ মেয়ের বাড়ির ঠিকানা এনে দিতে হবে।

ব্যাপারই না, প্রয়ােজন হলে ঐ মেয়ের পিছনে পিছনে গিয়ে বাড়ি চিনে আসবো।

-হৃদয় বললাে, ক্লাস শুরু হয়েছে চল ক্লাসে যাই ।

ক্লাসে গিয়ে দেখে কি অবাক কান্ড ঐ মেয়ে সেই ক্লাসে।

-হৃদয় বাবুকে ডেকে বললাে, দেখ সেই মেয়ে আমাদের ক্লাসে।

-তাহলে তাে তাের আরাে সুবিধা হলাে। সমস্ত ক্লাস হৃদয় শুধু ঐ মেয়েটির দিকে তাকিয়েই কাটিয়েছে। ক্লাস শেষে বাবু হৃদয়কে বললাে, তুই বাড়ি যা আমি তাের ভালবাসার ঠিকানা নিয়ে আসি ভালভাবে নিয়ে আসবি, কিন্তু ।

বাড়িতে এসে হৃদয় বিছানায় শুয়ে শুধু সেই মেয়েটিকেই দেখছে। মনের নেত্ৰদ্বারা অপরূপ চেহারা তার। মনে হয় বিধাতাকে নিজ হাতে বানিয়েছে । তার পছন্দ মত ।

-শবনম হৃদয়ের ঘরে এসে বললাে, হৃদয় তুমি একা কেন? বাবু কোথায়? কিছুক্ষণ পরেই আসবে। কলেজের একজন মেয়ের ঠিকানা খুঁজতে গেছে।

-হৃদয় বিছানা থেকে উঠে বসে বললাে, আন্টি আপনাকে একটা কথা বলবাে।

-কি কথা বলাে।

-আপনাকে আমার আন্টি বলতে ইচ্ছে হয় না।

-তবে কি বলতে ইচ্ছে হয় ।

-খালাআম্মা। খালাআম্মা বলতে আমাকে খুব ভাল লাগে ।

-খালাআম্মা ডাক শুনতে আমাকেও ভাল লাগে এখন থেকে খালাআম্মা বলেই ডাকবে কেমন? ঐতাে বাবু এসেছে তােমরা এক সঙ্গে মুখ হাত ধুয়ে খাবার টেবিলে এসাে ।

-যাচ্ছি আপনি খাবার রেডী করুন।

-বাবু আসতে হৃদয় বললাে, কিরে পেয়েছিস ঠিকানা?

-পাব না মানে বাড়ি চিনে এসেছি। নাম ঠিকানা সব জেনে এসেছি।

-তাড়াতাড়ি বল ।

-বাবু বললাে, একটু ধৈর্য্য ধর । আল্লাহপাক ধৈৰ্য্যধারিকে পছন্দ করেন।

-এদিকে খালাআম্মা ডাকছে, বাবু বললাে, চল আন্টি ডাকছে। খেয়ে দেয়ে সব বিস্তারিত বলবাে।

-হৃদয় বললাে, না এক্ষণি বল শুনেই যাওয়া হবে ।

-ঠিক আছে তাহলে শােন। মেয়েটির নাম মিস শান্তি । বাড়ি গুলশান ৫নং রােডের ৩ নম্বর বাড়ি। বিরাট ধনী তারা। বাবা ঢাকার একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী।

-বাবার নাম কি?

-বাবার নাম মোঃ আশরাফ চৌধুরী। সেই আশরাফ চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে মিস শান্তি ।

-খালাআম্মা এসে বললাে কি ব্যাপার তােমাদের খাওয়া নেই । কখন থেকে খাবার নিয়ে বসে আছি। অথচ দু'জনের কোন খবরই নেই ।

-হৃদয় বললাে আসছি খালাআম্মা ১ মিনিটের মধ্যে ।

-বাবু বললাে, কিরে খালাআম্মা ডাক আবার কখন থেকে শুরু করলি । এইতাে কলেজ থেকে আসার পর।

-বাবু বললাে তাহলে আমিও এখন থেকে ডাকবাে।

-ডাকিস আয় আগে খেয়ে নেই খুব খিদে পেয়েছে। পরের দিন কলেজ গিয়ে দেখে শান্তি কলেজে এসে তার বান্ধবীদের সাথে গল্প করছে । হৃদয় মনে মনে ভাবলাে আজ শান্তির সাথে কথা বলবে। আবার ভাবে যদি অপমান করে।

-বাবু হৃদয়কে বললাে কিরে হৃদয় শান্তির দিকে এক নজরে তাকিয়ে থেকে কি ভাবছিস। ভাবছি আজ শান্তির সঙ্গে কথা বলবাে। কিন্তু ভয় করছে। ভয় কিসের। তাছাড়াও প্রেমের জন্য অপমান হওয়া কোন ব্যাপারই না ।

-হৃদয় বললাে, আজ ক্লাস শেষ হলে বলবাে।

-ক্লাস শেষে হৃদয় বাবুকে বললাে, বাবু তুই বাড়ি যা। আমি আসছি।

-ভালভাবে কথা বলবি, উল্টা পাল্টা কিছু বলবি না বুঝলি । এই বলে বাবু বাসায় ফিরলাে।

-শান্তি তার গাড়ির দিকে যেতেই হৃদয় শান্তিকে ডাক দিয়ে বললাে, এই যে শুনুন।

-শান্তি হৃদয়ের দিকে ঘুরিয়ে মিষ্টি গলায় বললাে কিছু বলবেন? মানে। আমাদের ক্লাসে প্রায় সবার সাথেই কম বেশি পরিচয় হয়েছে কিন্তু আপনার সাথে একদিনও কথা হয়নি।

-শান্তি হাসতে হাসতে বললাে, আপনার মত করে কেউ আমার কাছে আসেনি। পরিচয় হতে। আপনার আশার জন্য আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।

-শান্তি বললাে, শুনুন তাহলে আমার পরিচয়, আমার নাম মিস শাহানারা পারভীন (শান্তি) সবাই আমাকে ‘শান্তি' বলে ডাকে। আপনার নামটা খুব সুন্দর। শান্তি খুব মিষ্টি নাম।

-শান্তি হাসতে হাসতে ডাইরী থেকে ১টি কার্ড দিয়ে বললাে, এই কার্ডে আমার বাসার ঠিকানা আছে। আমাদের বাড়িতে আসবেন।

-হৃদয় মৃদু হাসতে হাসতে বললাে, আসবাে অবশ্যই আসবাে।

-শান্তি বললাে, আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে দেরী হলে আম্মু চিন্তায় পড়ে যাবে। আবার দেখা হবে। যাই। কিন্তু আপনার পরিচয় পেলাম না।

-আজ যখন আপনার সময় নেই তাহলে আজ বলবাে না আর একদিন।

-ঠিক আছে আসি। এই বলে শান্তি মাইক্রো ঘুরিয়ে কলেজ থেকে বেড়িয়ে চলে গেলাে। হৃদয় রিক্সা নিয়ে বাড়িতে এলাে। খালাআম্মা বললাে, তােমাদের দুই জনের কিছু হয়েছে এক সঙ্গে কলেজ থেকে ফির না ।

-হৃদয় বললাে, না খালাআম্মা কিছুই হয়নি, এমনি। আমার কাজ ছিল তাই ।

-খালাআম্মা অন্য ঘরে গেলে বাবু হৃদয়কে বললাে, কিরে কথা বলতে পারলি? পারবাে না মানে, খুব ভালভাবে কথা বলেছি। দেখ আমাকে ওদের বাড়ির কার্ড দিয়েছে। আজ বিকেলেই ওদের বাড়ি যাবাে, ভালবাসার প্রস্তাব নিয়ে ।

-বাবু হৃদয়কে ছােট মনে করে বললাে, যা দেখিশ তােকে বাড়িতে ঢুকতেই দিবে না।

- না, না খুব সুন্দর ব্যবহার মেয়েটির, আমার বিশ্বাস ও আমাকে ফিরিয়ে দিবেনা ।

বিকেল ৫টার সময় হৃদয় ঠিকানা দেখে শান্তিদের বাসায় গিয়ে দেখে শান্তি ভিডিও গেমস্ খেলছে! হৃদয়কে দেখে শান্তি আশ্চর্য হয়ে বললাে, আরে তুমি । এসাে এসাে ভিতরে এসাে। ভিতরে নিয়ে হৃদয়কে ছােফায় বসিয়ে বললাে, ভিডিও গেমস্ খেলবে?

-হৃদয় বললাে, না তােমাকে আমার ঠিকানা জানাতে এসেছি।

-শান্তি আশ্চর্য হয়ে বললাে, শুধু ঠিকানা দিতে এসেছাে?

-না, তার সাথে একটা কথাও বলতে এসেছি। কিন্তু ! একটু সংকোচ করে বললাে হৃদয়।

-কিন্তু কি?

-তােমার বাবা মা নেই বাসায়?

-না, আল্লু অফিসে, আর আম্মু মার্কেটে গিয়েছে। আর দুই তিন জন কাজের বুয়া বাসায় আছে। হৃদয় সােফায় বসে আছে আর শান্তি হৃদয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।

-হৃদয় সােফা থেকে শান্তির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললাে, শান্তি তােমাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। প্রথম দেখাতেই তুমি আমাকে পাগল করে ফেলছ। তোমাকে আমি ভালবাসি শান্তি ভালবাসি।

-শান্তি হাসতে হাসতে বললাে, তােমার বাবা এই ঢাকা শহরে কোথায় ব্যবসা করে আমার বাবা তােমার বাবাকে চিনে কি?

-হৃদয় একটু মন খারাপ করে বললাে, না তােমার বাবা আমার বাবাকে চিনৰে

-তাহলে তোমার বাবা কি করেন?

-আমার বাবা একজন কৃষক। মা গৃহিনী।

-শান্তি আশ্চর্য হয়ে বললাে, কি বললে তুমি কৃষকের ছেলে?

-হ্যা আমার বাবা কৃষক।

-কৃষকের ছেলে হয়ে তুমি আমার বাড়িতে এসেছে, তাও আবার ভালবাসার প্রস্তাব নিয়ে। তােমার সাহসতাে কম নয়। তুমি চেনাে আমি কার মেয়ে। এই ঢাকা শহরের একজন নামকরা ধনী লােক আমার বাবা আশরাফ চৌধুরী । সেই লােকের একমাত্র মেয়ে আমি । আমার পিছনে শত শত কোটিপতির ছেলে ঘুর ঘুর করে ঘুরছে। শান্তি রেগে কাজের মেয়েকে ডেকে বললাে, এই নােংরা ছেলেটি যে দিক দিয়ে এসেছে সে সমস্ত কার্পেট তােরা বাসায় নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করবি। যে শোফায় হৃদয় বসেছিল। সেই সােফা দেখে দিয়ে বলল এই সােফা ধুয়ে পরিস্কার করবি । হৃদয় রেগে আগুন হয়ে বললাে এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মনে একই ভালবাসা জন্ম নেয় ধনী গরীব হয়ে নয়। কথাটি মনে রাখবে। এই কথা বলে হৃদয় বিদ্যুতের মত বাড়ি থেকে চলে এলাে।

রিক্সায় চড়ে হৃদয় আসছে। রিক্সায় বসে থাকতে পারছে না হৃদয়। মনে হয় ২ মন ওজনের পাথর তার মাথায় পড়েছে। বাড়িতে এলে বাবু হৃদয়কে দেখে বললাে, হৃদয় তাের চোখ মুখ ও রকম লাল হয়েছে কেন?

-কিছু হয়নি।

-হয়েছে। শান্তি তােকে কি বলেছে বল?

-সৰ পরে বলবাে এখন বলতে পারবাে না আমার মাথা খুব ব্যথা করছে আমি একটু ঘুমাবাে।

-বাবু রেগে বললাে, এক্ষণি তােকে বলতে হবে। বল তােকে কি করেছে।

-মা যা বলেছিল ঠিক। আর আমি কাউকে ভালবাসবনা। শান্তির দিকে আর ঘুরেও তাকাব না। পরদিন হৃদয় ক্লাসে যেতে দেখে শান্তি ও তার বান্ধবীরা মাঠে বসে গল্প করছে। হৃদয় তাদের পাস দিয়ে যেতেই শান্তি হৃদয়কে, দেখিয়ে দিয়ে বান্ধবীদের বললাে, ঐ যে ছেলে ক্লাসে হেঁটে যাচ্ছে সেই ছেলেটি গতকাল আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল ভালবাসার প্রস্তাব নিয়ে । সে নাকি আমাকে ভালবাসে। বাবা তার কৃষক। কৃষকের ছেলে হয়ে আমাকে পেতে চায়। কত বড় আশা বেচারার।

হৃদয় তাদের কথা শুনতে পেয়ে কিছুই বলতে পারল না। মাথা নিচু করে ক্লাসে দিকে গেলাে।

হৃদয় শুধু একটা কারণেই অপমান সহ্য করেছে। সে মনে করে ভালবাসার প্রস্তাব দেওয়া তারই ভুল হয়েছে। তাছাড়াও সে মনে করে তার মায়ের কথা অমান্য করার কারণে তার এই দশা। তাই যে প্রতিজ্ঞা করেছে এরকম ভুল কাজ সে আর করবে না।

ক্লাসে হৃদয় ভীষণ মনযােগ সহকারে স্যারের লেকচার শুনছে। শান্তির বান্ধবী শান্তির পাশেই বসে আছে। সে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

শান্তি তাকে ধাক্কা দিয়ে বললাে, কিরে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?

বান্ধবী বললাে, না এমনি। শান্তির বান্ধবীর নাম যুক্তা, শান্তিরও খুব ঘনিষ্ট। তারা দুজন প্রায় সব সময় একসঙ্গে থাকে। যুক্তার চোখ দুটো খুব সুন্দর । সে জন্য চেহারা তার খুব সুন্দর দেখায়।

-ক্লাস করতে করতে যুক্তা শান্তিকে ডেকে বললাে, এই শান্তি শােন।

-শান্তি বললাে, কি বলবি?

-হৃদয় ভাইয়ের চেহারা কিন্তু খারাপ নয়। দেখতে খুব সুন্দর, হ্যান্ডসাম বডি, ফিল্মের নায়কের চেয়ে কম নয়।

-ওর চেয়ে কত সুন্দর সুন্দর ছেলে আমার পিছে ঘুরছে। আর এ তাে সামান্য কৃষকের ছেলে ।

-যুক্তা বললাে আমার মনে হয় অন্য ছেলেদের চেয়ে হৃদয় একটু ভিন্ন ধরনের। ছাত্রও ভাল মনে হচ্ছে।

-তুই কি করে বুঝলি ছাত্র ভাল?

-দেখ না স্যারের লেকচার কত মনযােগ দিয়ে শুনছে?

-শান্তি বললাে, কি ব্যাপার তুই ওর পক্ষে কথা বলছিস কেন? তাের পছন্দ হয়েছে মনে হয়। পছন্দ হলে ওর সাথে প্রেম কর।

-যুক্তা একটু রেগে বললাে, পক্ষে কথা বললেই প্রেম হয় না। ঠিক আছে কথাই বলবাে না। ক্লাস শেষে হৃদয়, বাবু এক সাথে সােজা বাড়ি ফিরল ।

চলাবে.........

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.