দুই পুরুষ (উপন্যাস) পর্ব-৮
দুই পুরুষ
এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন
উপন্যাস (পর্ব-৮)
- আয় ভিতরে আয় তােদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বস এখানেই বস। চাঁদকে
লক্ষ্য করে বলল কেমন আছাে ?
-চাঁদ একটু লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসতে হাসতে বলল,
এইতাে ভাল আছি আপনি কেমন আছেন ?
-আছি ভালাে কিন্তু তােমাদের মত না। ঠিক আছে
তােমাদের সময় নষ্ট করবাে না।
-চাঁদ বলল, ভাইয়া আপনাকে কষ্ট দিলাম।
-না আমি
তাে প্রতিদিনই এই সময় কলেজে যাই একবারে তিনটা টিউশনি করে বিকালে ফিরি। এই
বলে সে চলে গেল। দরজার দুই এক জায়গায় ফুটো আছে তবে দেখা যাচ্ছে না। কাগজ
দিয়ে ঢেকে দেওয়া আছে। মেস সাধারণত ভাল হয় না। যে গুলাে বাসায় ফ্যামেলি
থাকার অনুপযােগী হয় সে গুলাে বাসা ছাত্রাবাস হিসেবে ভাড়া দেয় মালিকেরা।
তুষার দরজার ছিটকিনি লাগানাের সংগে সংগে চাঁদ তার শরীর থেকে উড়না ফেলে
দিল। কি ব্যাপার দেখতে খারাপ লাগছে তাে।
- লাগুক তুমি ছাড়া তাে আর কেউ নেই
এখানে। তুমি দেখবে নাতাে কে দেখবে।
-তা ঠিক আছে কিন্তু এখনি আসলাম একটু
গল্প করি দু’জন।
-আচ্ছা ঠিক আছে বলাে।
- তােমাকে একটা বই পড়ে শুনাই তুমি
মনেযােগ দিয়ে শুনবে।
-চাঁদ একটু অস্থির অস্থির চোখে বলল, এখন এগুলাে শুনতে
ইচ্ছে করছে । রাখতাে।
-বেশীক্ষণ লাগবে না। খুব বেশী হলে ১০ মিনিট।
-ঠিক আছে
বল।
তুষার বইটি বের করে পড়তে শুরু করার আগে চাঁদকে বলল, যখন আমি পড়বাে,
পড়া শেষ হবার আগ পর্যন্ত কথা বলবে না কেমন ?
- ঠিক আছে বল ভালভাবে শুনছি।
প্রভূ ! বীভৎস ঘৃণিত কুৎসিত মুখ আমি দেখতে চাই। আমার হাত তুমি ধর, আমি
শয়তানের মুখ দেখবাে- খুব ভাল করে তাকে দেখবাে। শয়তান কেমন করে আমাকে
মুগ্ধ করে। আমার শিরায় শিরায় প্রবেশ করে, আমাকে উদভ্রান্ত করে,
আমাকে তােমার স্নেহ-মধুর পূত- নির্মল সহবাস হতে ইঙ্গিত বিভ্রান্ত করে।
সমস্ত অন্তর দিয়ে তাকে ঘৃণা করতে চাই। তাকে দেখি নাই বললে চলবে না তার
ঘৃণিত, পৈশাচিক মুখ আমায় দেখাও আমার দেহের অনু পরমানু ঘৃণায় বিদ্রোহী
হয়ে উঠুক, সমস্ত অন্তর দিয়ে আমি শয়তানকে ঘৃণা করতে চাই।
অনেক সাধনা
করেছি, অনেক রাত্রি তােমার ধ্যানে কাটিয়েছি। আমার সমস্ত শরীর তােমার পরশ-
পুলকে অবশ হয়ে উঠেছে; আমাতে আমি নাই, আমার নয়ন দিয়ে তােমার প্রেমের
অশ্রু ঝরছে। পৃথিবীর সমস্ত আবিলতা মুক্ত হয়ে তােমার প্রেমে ধন্য হয়েছি;
অকস্মাৎ চোখের নিমেষে শয়তান এসে আমার সর্বনাশ করে গেল। আমাকে এক মূহুর্তে
পাতালের গভীর কুপে ফেলে গেলে . ক্ষণিকের লােভে মানুষের মাথায় বজ্রাঘাত
করলাম, অন্ধকার নিশীথে, পশুর নেশায় বারবনিতার সৌন্দর্য শ্রীতে ডুবে মরলাম
গােপনে লােক চক্ষুর অগােচরে কুকার্যে আসক্ত হলাম মানুষের বুদ্ধি অনুভূতির
অন্তরালে প্রতারণায় আত্মনিয়ােগ করালাম। প্রভূ, কে আমায় রক্ষা করবে ?
মানুষ আমার পাপ দেখে নাই আমি একাকি দেখেছি আমাকে- শয়তান আমার সর্বনাশ
করেছে। প্রভূ মানুষেরে অগােচরে আমায় দুর্জয় কর, শয়তানের কুৎসিত মুখশ্রী
আমায় দেখাও।
পৃথিবীর যত পাপ-পৃথিবীর যত প্রতারণা, নিশ্চয়তা হীনতা
কাপুরুষতা সমস্ত মুঢ়তা গােপন পাপ, নারীর ব্যভিচার আজ আমি ভাল করে দেখতে
চাই।
একটা দরিদ্র লােক জীবনভর কষ্ট করে কিছু টাকা উপার্জন করেছিল। একদিন এক
নামাজীকে তার বাড়িতে গিয়ে গভীর রাতে ২০০০০ টাকা হাওলাদ করে আনতে
দেখেছিলাম। নামাজী সে দিন বিয়ে করতে যাচ্ছিল, খুব বিপদে পরেই তাকে সেখানে
টাকার জন্য যেতে হয়েছিল। ২০০০০ টাকা সে চাওয়া মাত্র পেয়েছিল। কোন সাক্ষী
ছিল না, কোন লেখাপড়া বা দলিল হয় নি। এই ঘটনা দেখেছিলেন শুধু আল্লাহ আর
নামাজীর অন্তর মানুষ। তারপর দশ বছর অতীত হয়ে গেছে। লােকটি মারা গেছে। তার
বিধবা পত্নী নামাজীর বাড়িতে হেঁটে হেঁটে হয়রান হয়ে এখন আর হাঁটে না। এই
ব্যক্তিকে লােকে মুসলমান বলে, মানুষ তাকে সালাম করে। তাকে অমানুষ বলে ধরবার
কোন পথ নেই । সে পাঁচটি ফরজই আদায় করে। কে তাকে কাফের বলবে ? কিন্তু আমি
দেখেছি তারই মুখে শয়তানের বিশ্রী চেহারা।
শয়তান! আমি তাের মুখ আরােও
ভালাে করে দেখতে চাই। প্রভূকে যেমন করে দেখেছি, তােকেও তেমন করে দেখতে চাই-
অনন্ত ভাবে আমি তাের ঘৃণিত কুৎসিত
নগ্ন ছবি দেখতে চাই। আমি সমস্ত প্রাণ দিয়ে তােকে ঘৃণা করতে চাই। ভাল করে
তাের মুখ আমায় দেখা, আমি দুই হাত দিয়ে ভাল করে স্পর্শ করে তােকে দেখতে
চাই।
শমসের এবং হাসান দুই ব্যক্তি কথা বলছিলেন, শমসের বললেন- আপনি মহা
মানুষ, দেশ-সেবক, আপনার কাছে আমি চীর ঋণী।
হাসান বলল, জনাব আমার জীবন
অনিত্য, কোন সময় যাই তার ঠিক নেই, আমার কাছে কৃতজ্ঞ হবার কোন দরকার নেই।
সমসের বললেন- আপনার কাছে আমি চীর কৃতজ্ঞ, আপনি মহা মানুষ।
অতঃপর হাসান সে
স্থান থেকে চলে গেলেন। তার স্থান ত্যাগ করা মাত্র শমসের বললেন- এই
ব্যক্তিকে আমি চিনি , ভারী শয়তান। শমসেরের মুখে দেখলাম কাপুরুষ নিন্দাকারী
শয়তানের বীভৎস ছবি। শয়তানের হাত থেকে রক্ষা চাই। আমাদের এই সুপবিত্র
মুখশ্রীতে শয়তানের মুখ ফুটে না উঠুক।
একটি বন্ধু আর একটি বন্ধুকে
ভালবাসতাে। প্রথম বন্ধুটির ঘরে দ্বিতীয় বন্ধুটি প্রায় যেতাে। প্রথম বন্ধু
দ্বিতীয় বন্ধকে বিশ্বাস করতাে ভালবাসতাে। একদিন দেখলাম দ্বিতীয় বন্ধু
প্রথম বন্ধুর অনুপস্থিতিতে প্রথম বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে অবৈধ প্রেমালাপে
মত্ত। শয়তানের মুখ দেখতে বাকী রইল না। শয়তানকে ভাল করেই চোখের সামনে
দেখলাম।
একটি যুবক, সে বক্তৃতা করতাে, এক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক সে। এক
বুড়ির বাড়িতে সে যেতাে। বুড়ি তাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতাে, স্নেহ করতাে,
একটুও অবিশ্বাস করতাে না। বুড়ি যুবককে গৃহে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতাে।
বুড়ির একটি মাত্র অবলম্বন ছিল বার বৎসরের প্রিয় সন্তানটি। দেখতে বেহেশতের
পরীবালিকার মত। এই যুবক বালিকাটিকে ভালবাসতাে, বুড়ি প্রাণ ভরে দেখতাে তার
পিতৃহীন সন্তানকে, যুবককেও ভালবাসে, স্নেহ করে, প্রাণ ভরে সে যুবককে
আশীর্বাদ করতাে। একদিন যুবক এই শিশুর পবিত্র মুখে গােপনে চুম্বন করলাে।
স্বর্গের শিশুটি যুবকের মুখের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে
এই শিশুকে নষ্ট করল। তার সােনার হৃদয়-কুসুমে পাপের হলাহল ঢেলে দিল। বুড়ির
নয়ন পুত্তলির সর্বনাশ হয়ে গেল। বুড়ি তা জানতে পারল না, তার সাজানাে
বাগানে যুবক আগুন ধরিয়ে দিল। এখন দেখি বুড়ি অন্ধ, রাস্তায় রাস্তায়
ভিক্ষা করে। শিশুটি ধিরে ধিরে বড় হয়ে নষ্টের পথে চলে গেছে। সেই সম্পাদক
যুবক কে কেউ জানে না, তাকে মানুষ নমস্কার করে।
নিকটে গেলে আসন এগিয়ে দেয়। অনেক টাকা তার , আমি তার মুখ দেখলেই ভয় পাই।
সম্মুখে সাক্ষাৎ শয়তান দেখে শিউরে উঠি।
এক সম্রান্ত ব্যক্তির গৃহে তার
সেয়ানা মেয়েটি থাকতাে। মেয়েটির স্বামী বিদেশে থাকেন। দ্র লােকের বাড়িতে
তার এক দূর সম্পৰ্কীয় আত্নীয় থাকতাে। দেখলাম একদিন সেই মেয়েটি সেই
যুবকটির সঙ্গে গােপনে আলাপ করছে। মেয়েটির মা বােনেরা তা জানে। জাত যাবার
ভয়ে কথা বলে না। নির্জন কক্ষে এই দুটি বিশ্বাস ঘাতক কথা বলে, এক সংগে
খায়। যুবকটি ভয় করে, অনিচ্ছা প্রকাশ করে। বিবাহিতা অবিশ্বাসহীন যুবতিটি
তাকে বলে- কোন ভয় নেই। দুই বৎসর পরে দেখলাম- এক জায়গায় বাবুর গৃহিনী
রূপে এই মেয়েটিকে। বাবু পরম বিশ্বাসে পত্নীর সঙ্গে প্রেমালাপ করছে।
স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে আনন্দে কথা বলছে।
এই দৃশ্য দেখে শােকে আমার চোখ জলে
ভরে উঠলাে, শয়তানের এই অভূতপূর্ব কীর্তির ছবি চোখ দিয়ে দেখলাম, অসহ্য
দুঃখে ভাবলাম মানুষের অত্যাচার এবং মুখতা অবিচার আর শয়তানের প্রাণঘাতি
কীর্তি।
এক মহাজন এক ব্যক্তিকে ১০ লক্ষ্য টাকা দিয়েছিলেন। লােকটি একদিন
মহাজনের সর্বনাশ করার জন্যে চালাকী করে ঘরের সিদ কেটে দুপুর রাতে কাঁদতে
আরম্ভ করলাে। লােকজন যখন জমা হলাে, সে কেঁদে বলল, তার সর্বনাশ হয়েছে- চোর
তাকে সর্বশান্ত করে গেছে। কি করে সে মহাজনকে মুখ দেখাবে ? প্রাত:কালে সে
মহাজনকে টেলিগ্রাম করল। থানার কর্মচারীর সঙ্গে রাত্রে গােপনে সে দেখা করল।
চুরি যে ঠিক হয়েছে এবং সে যে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তা প্রমাণ হয়ে গেল। তার
মিছে সর্বনাশের কেউ প্রতিবাদ করল না, করতে কেউ সাহস পেল না ।
এই নিমক হারাম
বিশ্বাসঘাতক সেই লােকটি সেই টাকা নিয়ে এসে বাড়িতে মসজিদ ঘর তুলল। সেই
ঘরে বসে সে বন্দেগী করে। মানুষের মুখে সে প্রশংসা ধরে না। কত মানুষ তার
গৌরব করে, কত মৌলবীর মুরুব্বি সে, কত ভদ্র লােকের বন্ধু সে। আমি তার মুখ
দেখলেই ভয় পাই। তার মুখে কার বীভৎস মুখ দেখে উত্তেজীত হয়ে উঠি। ঘৃণায় সে
স্থান ত্যাগ করি ।
অনেক দিন পূর্বে এক ব্যক্তি অন্য এক জেলায় গিয়েছিল।
সেখানে গিয়ে সে এক নব যৌবনাকে বিবাহ করেছিল। সে ঐ মেয়ের যুবতী যৌবনের রূপ
ঐশ্বর্য দেখে তাকে ভােগ করার লােভ সংবরণ করতে না পেরে সে প্রতারণা করে
তাকে বিয়ে করেছিল। যখন তার পিপাসা মিটে গেল, তখন একদিন আসি’ বলে ঐ পালিয়ে এল, আর সেখানে সে যায় নি। সে মেয়ে যে কত বছর ধরে পথের পানে তার
প্রিয়তমের আসায় চেয়েছিল, তা কে জানে ? এই যুবক একজন | ধার্মিক দ্রলােক।
সমস্ত ধর্ম সাধনাই তার ব্যর্থ হয়েছে। প্রভু আর আমি জেনেছি সে কে।
এক ব্যক্তি
মরে গেছে। সে যে বিপুল সম্পত্তি রেখে গেছে তার জন্য তার বংশের মর্যদা
বেশ-জোড়া। সে ছিল এক জমিদারের নায়েব। জমিদার বিশ্বাস করে তার সম্পত্তি
নায়েবের হাতে দিয়ে আনন্দ করে বেড়াতাে। ধীরে ধীরে জমিদারের নায়েব নিজেই
জমিদার হল তার এখন কত সম্মান, মানুষ তার নামে দোহায় দেয় কত ইট পাথর তার
বাড়িতে কত বড় বড় প্রতিমা তার ঘরে উঠে। আমি তার বাড়ির সামনে গেলেই হাসি-
শয়তানের ভণ্ডামী দেখে জ্বলে উঠি। ( শয়তান মানুষকে কত রকমেই না প্রতারণা
করে। শয়তান তার মুখেই দেখাই যায়।
এক কেরানী তার স্ত্রীকে ভীষণ
ভালবাসতাে। সারাদিন সে পােষ্ট অফিসে গাধার খাটুনি খাটতাে। আর তারই মাঝে তার
স্ত্রীর চাঁদ মুখখানী বুকে জেগে উঠতাে। মাতাল যেমন মদ খেয়ে তার দূর্বল
দেহটাকে সবল করে নেয়। সেও তার দূর্বল দেহটাকে সবল করে নেয় তার স্ত্রীর
মুখ দেখে। পােষ্ট অফিসের ভারী ব্যাগ গুলি ধাক্কা মেরে সে ১০ হাত দূরে ফেলে
দিত। সে যখন বাসায় ফিরতে বাজার থেকে এক গােছা গলদা চিংড়ি মাছ কিনে শিস
দিতে দিতে বাড়ি আসতাে, স্ত্রীর হাতে সেগুলি দিয়ে ভালবাসার দৃষ্টিতে তার
মুখের দিকে চেয়ে থাকতাে।
এক ছােকড়া ঐ বাড়িতে আসতাে। কেরানী তাকে পুত্রের
মত স্নেহ করতাে। তার বয়স ১৮ কি ২০ হবে। একদিন ছােকড়ার সংগে ঘরখানি খালি
করে স্ত্রীটি চলে গেল। এখন সে পতিতা। রাস্তার পাসে দাড়িয়ে হাসে, একদিন
বাড়িতে ঝগড়া করে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেখলাম সেই পতিতার
উজ্জ্বল দ্বীপ্ত লােহিত মুখ। সেই মুখে দেখেছিলাম শয়তানের কুৎসিত মুখ-
বীভৎস দৃষ্টি। হৃৎপিণ্ডে আগুন জ্বলে উঠেছিল, আন্তরিক ঘৃণায় সেই স্থান
ত্যাগ করলাম। মহা পাপের মুখ দেখে আমি শিউরে উঠেছিলাম।
মিথ্যাবাদী,
তােষামােদকারী, হৃদয়হীনের মুখে আমি দেখেছি শয়তানের মুখ । পরশ্রীকাতর,
অপ্রেমিক, মােনাফেকের মুখে আমি দেখেছি শয়তানের মুখ। জগতের সমস্ত ধন
সম্পদের বিনিময়ে শয়তানের মুখের সংগে আমার মুখ ....
চলবে............


কোন মন্তব্য নেই