লাভ (উপন্যাস) পর্ব-৭
লাভ
এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন
(উপন্যাস) পর্ব- ৭
হৃদয়ের বাড়ির সামনে মাইক্রো থামিয়ে বাড়ির ভিতরে যেতেই মিসেস শবনম
শান্তিকে দেখে চশমা চোখ থেকে খুলে হাতে নিতেই শান্তি বললাে, আন্টি এটা কি
লেখক মহাতাব উদ্দিন এর বাড়ি?
-মিসেস শবনম চিন্তিত হয়ে বললাে- তুমি কে?
-আমি তার ক্লাস ফ্রেন্ড। উনার লেখা উপন্যাস আমার অসম্ভব ভাল লেগেছে। এত
সুন্দর উপন্যাস আমি কোন দিন পড়িনি। অনেক দিন ধরে তার ঠিকানা খুঁজছি। আজ
পেলাম । তার সাথে দেখা করতে এসেছি। উনি কি বাসায় আছেন?
-আছে, যাও। সােজা
দু'তলায় উঠে ডান পাশে যে ঘরটি দেখবে সেই ঘরেই আছে লেখক মহাতাব উদ্দিন
-হাসতে হাসতে বললাে, থ্যাংক ইউ।
-হৃদয় খুব মনােযােগ দিয়ে চেয়ারে বসে বই
পড়ছে। শান্তি দু'তলায় উঠে ডান দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাে ডান পাশের ঘরের
দরজা খােলা। ভিতরে গিয়ে দেখে লােকটি খুব মনােযােগ দিয়ে বিপরীত দিক হয়ে
লেখাপড়া করছে।
-শান্তি ঘরে ঢুকে ভিতু ভিতু হয়ে বললাে, আপনি মহাতাব
উদ্দিন?
-হৃদয় জি বলেই পিছনে তাকালাে, শান্তি হৃদয়কে দেখেই থমকে গেল ।
-হৃদয় হাসি মুখে অবাক হয়ে বললাে, আমি ভাবতেই পারছি না, আপনি এই গরিব
কৃষকের ছেলের কাছে, কি মনে করে। আপনি আসার জন্য আমি খুব আনন্দিত। শান্তি
লজ্জায় আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দৌড়ে নেমে এসে মাইক্রো চালিয়ে
বাড়ি ফিরল । হৃদয় কিছু বুঝতে পারলাে না। রাতে শান্তির ঘুম আসছে না। শুধু
হৃদয়ের কথা মনে পড়ছে। একটি চিন্তা শান্তিকে অবাক করে দিচ্ছে । হৃদয় যখন
আমার বাড়িতে এসেছিল তখন আমি তাকে কতই অপমান করেছি কিন্তু আজ তার বাড়ি
গেলাম কিন্তু সে আমাকে অপমান করা ত দুরে থাক, আমি যাওয়ার জন্য সে ভীষণ
খুশি ! সত্যিই হৃদয় মহৎ লােক। আমি হৃদয়কেই ভালবাসব । তাছাড়াও আমি
প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এই উপন্যাস লেখক যদি অবিবাহিত হয় তাহলে তাকেই আমি
ভালবাসবাে । আগামী কালকেই আমি তাকে ভালবাসার কথা জানাবাে।
পরের দিন কলেজে
যেতেই যুক্ত শান্তিকে দেখে বললাে, কিরে আজ তুই এতাে খুশি কেন?
-শান্তি
বললাে, আজ আমার ভালবাসার মানুষকে খুঁজে পেয়েছি।
-তাহলে লেখক মহাতাব
উদ্দিনকে খুঁজে পেয়েছিস মনে হচ্ছে।
-জি পেয়েছি। সে আমাদের
কলেজের এবং আমাদের ক্লাসের ছাত্র ।
-যুক্তা আশ্চর্য হয়ে বললাে, কে সে আজ
পর্যন্ত তাকে আমরা কেউ চিনলাম না
-আমরা সবাই চিনি, সে প্রতিদিন ক্লাসে আসে
এবং ভাল ছাত্র। তার ভাল নাম কেউ জানে না। তাই আমরা কেউ চিনতে পারিনি।
-যুক্ত বললাে, তার ডাক নাম কি?
-তার নাম হচ্ছে হৃদয়।
-সত্যি বলছিস? আমার
বিশ্বাস হচ্ছে না সে এতাে সুন্দর উপন্যাস লিখেছে। তুই এতদিন ঠিকই বলেছিস
হৃদয় গরিব হলে কি হবে সে মহৎ ছেলে। যুক্তা মন খারাপ করে বললাে, ওকে তুই
অনেক অপমান করেছিস। আমার মনে হয় তােকে সে ভালবাসবে না।
-আমি আমার জীবনে যা
চেয়েছি তাই পেয়েছি। আমার মনের সিংহাসনে এতােদিন কাউকে বসাইনি। আজ সেখানে
হৃদয়কে বসিয়েছি। তাকে না পেলে আমি আত্মহত্যা করবাে। তবুও ঐ সিংহাসনে
অন্য কাউকে বসানাের স্বপ্ন দেখব নী ।
-দোয়া করি তাের আশা যেন পূরণ হয় ।
-ক্লাস শেষে শান্তি হৃদয়কে ডেকে বললাে, আপনার সাথে আমার কিছু জরুরী কথা
আছে।
-বলুন, কি কথা।
-এখানে নয় ওদিকে চলুন।
-হৃদয় বললাে, তাহলে একটু
দাঁড়ান আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।
-হৃদয় বাবুর কাছে গিয়ে বললাে তুই
বাড়ি যা আমি একটু পরে আসছি। এদিকে যুক্তা শান্তিকে বললাে, আমি কলেজের
বাহিরে আছি তুই বলে আয় ।
-শান্তি বললাে, দোয়া করবি আমি যেন আমার
ভালবাসাকে পাই ।
-ঠিক আছে থাক। এই বলে যুক্ত কলেজের বাইরে গেল । হৃদয় এসে
বললাে, চলুন কোথায় বসবেন। বট গাছের নিচে গিয়ে হৃদয় বললাে, কি বলবেন
বলুন। শান্তি ভয়ে কিছুই বলছে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৫ মিনিটের
মত। হৃদয় বললাে, কিছুই বলছেন না যে। ভুলে গেলেন নাকি? ভুলে গেলে কালকে
বলেন। আজ তাহলে থাক। আমি যাই ।
-শান্তি বললাে, ভুলিনি তবে খুব ভয় হচ্ছে।
-ভয় কিসের আপনারা অনেক ধনী, যা চান তাই পান। যা বলেন তাই হয় । আমার মত
গরিবের সঙ্গে আপনার কথা বলতে আবার কিসের ভয় ।
-শান্তি বুক ভরা সাহস নিয়ে
বললাে হৃদয় আমি তােমাকে ভালবাসি। I Love you আমি তােমাকে ছাড়া বাঁচব না।
তুমি শুধু আমার ।
-হৃদয়
হাসতে হাসতে বললাে, এই সমস্ত কথা আপনাদের মুখে কিছুই না। এ সমস্ত কথার এক
বিন্দুও মূল্য দেন। আপনারা। আজ আমাকে আপনি বলে আমাকে পাগল করে। কাল
আরেকজনকে। সে ধরনের অবুঝ ছেলে হৃদয় নয়। আমি জানি আপনি আমাকে ক’দিনের জন্য
ভালবাসবেন। তাছাড়াও আমার মনে হয় আপনি লােক চিনতে ভুল করছেন। ভাল করে
দেখুনতাে আমাকে দেখতে আপনার ভুল হচ্ছে কিনা?
-হৃদয় ভীষণ রাগ হয়ে বললাে,
যে ছেলে আপনাদের বাড়ি গেলে কার্পেট নষ্ট হয়ে যায়। যে সােফায় বসলে সােফা
ময়লা হয়ে যায় । কৃষকের ছেলে বলে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরকম নিকৃষ্ট
ছেলেকে আপনি ভালবাসার প্রস্তাব দিচ্ছেন?
-হাসতে হাসতে হৃদয় বললাে, আপনি
আমাকে চিনতে ভুল করছেন এতে কোন সন্দেহ নেই। বাড়ি গিয়ে ভাল করে চিন্তা করে
দেখবেন অন্য কোন ছেলেকে আপনি পছন্দ করেছেন। আমাকে না। এই ঢাকার বিখ্যাত
ধনীর এক মাত্র ছেলেকে। অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেল আপনার সাথে আজেবাজে গল্প
করতে । যাই বেশী দেরী হলে খালাআম্মা রাগ করবে। এই বলে হৃদয় যেতেই শান্তি
রাগ হয়ে ক্ষোভে বললাে দাঁড়াও। এই বললে হৃদয় দাঁড়ালাে, শান্তি তার
মাইক্রো থেকে একটা ধারালাে ছুড়ি নিয়ে এসে বললাে, তুমি যদি আমাকে না
ভালবাস তাহলে তুমি এই কলেজ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ছুড়ি দিয়ে
আমার হাত কেটে শরীর থেকে সমস্ত রক্ত শেষ করে এখানেই মারা যাব।
-হৃদয় হাসতে
হাসতে বললাে, আপনি কি করবেন আমি জানি। এই বলে হৃদয় তার কথা বিশ্বাস না
করে কলেজের ভিতর থেকে রিক্সা নিয়ে চলে গেল। যুক্তা হৃদয়কে রিক্সায় চড়ে
চলে যাওয়া দেখতে পায়নি। তাই মনে করেছে ওরা এখনও গল্প করছে। কলেজে কেউ
নেই। হৃদয় ভেবেছে আবার অপমান করার জন্য এ সমস্ত বুদ্ধি করেছে। তাই শান্তির
কথা নিয়ে হৃদয় বেশী মাথা ঘামালনা । সােজা বাড়ি চলে গেলাে। বাড়িতে
গিয়ে শান্তির কথা হৃদয় ভুলে গেছে । হৃদয় ও বাবু দুপুর ২টার সময়
খাওয়া-দাওয়া করে এক সাথে ঘুমিয়ে পড়েছে বিকাল সাড়ে তিনটায় । ফোন
এসেছে, খালাআম্মা ফোন ধরেছে। খালাম্মা বললাে হৃদয় ভাইকে খুব শিঘ্রি ফোনটা
দিন। খালাআম্মা বললাে, তুমি একটু ধর আমি হৃদয়কে ডেকে দিচ্ছি। খালাআম্মা
হৃদয়কে ঘুম থেকে ডেকে বললাে, এক মেয়ে ফোন করেছে, খুব জরুরী।
-হৃদয় ঘুমের
মধ্যে বললাে, কোন মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। বলে দিন রং নাম্বার।
রং
নাম্বার নয় তােমাকে ডেকেছে।
-হৃদয়
বিরক্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠে গিয়ে ফোন ধরে বললো, হ্যালাে কে আপনি?
-যুক্তা
তড়িঘড়ি করে বললাে, আমি যুক্তা। শান্তি খুব অসুস্থ। এর শরীর থেকে অনেক
রক্ত পড়েছে । বাঁচানাে খুব কষ্ট, ও এখন ঢাকা হাসপাতালে ৫নং কেবিনে ।
-হৃদয় বললাে, শান্তি অসুস্থ তো আমি কি করবাে। এই বলে হৃদয় ফোন রেখে আবার
ঘুমোতে গেলাে। হৃদয়ের কলেজের কথা মনেই নেই । বিছানায় মাথা রাখতেই হৃদয়ের
মনে হলো, কলেজে শান্তি হাত কাটতে চেয়েছিল । তাহলে সত্যিই সে হাত কেটেছে?
হৃদয় লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পাগলের মত ছুটে গেল ঢাকা হাসপাতালে। ৫নং
কেবিনে গিয়ে দেখে সত্যিই শান্তি হাত কেটে রক্ত ঝরিয়েছে। ডাক্তার বললাে, ও
নেগেটিভ রক্ত নেই। রক্ত ছাড়া রােগীকে বাঁচানাে যাবে না। হৃদয় বললাে,
আমার রক্ত ও নেগেটিভ । তাড়াতারি করে আমার রক্ত নিন। তাছাড়া আমার শান্তিকে
বাঁচানাে যাবে না । শান্তি অজ্ঞান। হৃদয় পাশের বেডে শুয়ে শান্তিকে রক্ত
দিচ্ছে । রক্ত নেওয়া। শেষ । হৃদয় উঠতে চাইলে ডাক্তার বললাে আপনি একটু
রেষ্ট নিন।
শান্তির জ্ঞান ফিরলে হৃদয়কে দেখে বললাে- তুমি এখানে কেন?
-হৃদয় হাসি মুখে বললাে, শান্তিকে বাঁচাতে হলাে তাই এখানে এসেছি।
-কেনাে
বাঁচালে?
-হৃদয় শান্তির দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে হাসতে হাসতে বললাে, আমার
শান্তিকে আমি বাঁচাবাে না কাকে বাঁচাবাে।
-তার মানে তুমি আমাকে ভালবাস?
-প্রাণের চেয়েও বেশী ।
-শান্তি খুশিতে বিছনা থেকে উঠে হৃদয়কে জড়িয়ে ধরে
বললাে, আর আমার কিছু প্রয়ােজন নেই। আমি তােমাকে পেয়েছি। আর ছাড়বাে না।
-হৃদয় বললাে, বিছানা থেকে উঠলে কেন আবার অসুস্থ হয়ে পড়বে। এই বলে হৃদয়
শান্তিকে তার বিছানায় শুইয়ে দিল ।
-শান্তি বললাে, আমার কাছ থেকে উঠবে না।
সারাক্ষণ আমার পাশে বসে থাকবে। ঠিক আছে উঠবাে না ।
-ডাক্তার বললাে আজ রাত
থাকতে হবে। কাল সকালে নিয়ে যেতে পারবেন । এই বলে শান্তিকে ঔষধ খেয়ে
দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শান্তি ঘুমিয়ে পড়লাে।
-হৃদয় যুক্তাকে বললাে, ওর
বাবা মাকে জানাবে না। ও অসুস্থ কাল সকালে একেবারে সুস্থ হয়ে গেলে আমি
নিয়ে যাব। বুঝলে?
-ঠিক আছে আপনি বাড়ি যান।
-আমি এক্ষুণি আসছি। বাড়ি যাব
না। এদিকে শান্তির বাবা, মা প্রায় পাগলের মত শান্তিকে খুঁজছে। কোথাও নেই ।
মা সারা রাত দরজা খুলে বাহিরে বসে আছে।
-শান্তি বললাে, কাল ক্লাসে আসবে কিন্তু।
-ঠিক আছে আসবাে। তুমি আগে বাড়ি যাও।
বাড়িতে যেতেই শান্তির মা শান্তিকে
জড়িয়ে ধরে খুশিতে কাঁদতে লাগলাে। বললাে আমার শান্তিকে পেয়েছি। শান্তির
বাবা রাগে বললাে, বল কোথায় গিয়েছিলে?
-শান্তির মা রাগে বললাে ও এখন কিছু
বলতে পারবে না। ও এসেছে আমার আর কিছুই প্রয়ােজন নেই। শান্তি কারাে সাথে
কথা না বলে সােজা তার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
-ভালবাসা এমন একটি রােগ
যে রােগে সবাই একবার পড়তে চায় । শান্তি তার ব্যতিক্রম হয়নি। শান্তির
মনের মধ্যে যে হৃদয় ঢুকেছে সেই হৃদয় আর বের হবে না। শান্তি মরে গেলেও।
এখন শুধু হৃদয়রেই কথা বলে শান্তির মন। আর কারও নয়। বলবেও না।
-পরদিন
ক্লাসে এসে শান্তি যুক্তাকে বললাে, কিরে যুক্তা হৃদয় আসেনি?
-যুক্তা হাসতে
হাসতে বললাে, কিরে একদিন না যেতেই হৃদয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছিস যে ।
-শান্তি আনন্দে রাগ করে বললাে, এই যুক্তা বেশী কথা বলবি না, আমি আমার
হৃদয়কে দেখবাে তাের কি?
-যুক্তা শান্তিকে দেখিয়ে দিয়ে বললাে, ঐ যে আপনার
নব নায়ক এসেছে, যান দেখা করুন । শান্তি যাই, থাক, পরে তাের সাথে দেখা
করবাে, মন খারাপ করিস না ।
-মন খারাপ করবাে কেন। তাের ভালবাসাকে পেয়েছিস
এতাে আমারও খুশির কথা। আমি যদি তাের স্থানে হতাম তাহলে আরাে বেশী কিছু
করতাম।
-শান্তি হৃদয়ের কাছে গিয়ে বললাে তুমি এতাে দেরীতে এলে কেন? কখন
থেকে আমি তােমার জন্য বসে আছি।
-হৃদয় বললাে, আমিতাে প্রতিদিন এই সময়ই আসি
।
-এবার থেকে আরাে আগে আসবে। -ঠিক আছে নব প্রেমিকা, ঠিক আছে। কিন্তু এখন
ক্লাসে চলাে। না আজ ক্লাসে যাব না। তােমাকে নিয়ে এক জায়গায় যাব ।
-দু’দিন না যেতেই এই অবস্থা। অবস্থাটার দেখলে কি? কেবল শুরু। বেশী কথা না
বলে মাইক্রোতে উঠো। কোন কথা বলবে না। যেখানে নিয়ে যাব সেখাইে যাবে।
-ঠিক
আছে চলো।
-যুক্তা তার বান্ধবীদের দূর থেকে দেখিয়ে দিয়ে বললাে, দেখেছিস কি
ছিল কি হয়ে গেল।
চলবে............


কোন মন্তব্য নেই