দুই পুরুষ (উপন্যাস) পর্ব-১১
দুই পুরুষ
এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন
উপন্যাস পর্ব-১১
তাের মনে আছে কি না জানি না, তুই আর আমি রিক্সা করে যাচ্ছিলাম তুই চলে গেলি
কলেজে আর আমি মাঝ পথে নেমে পরলাম।
-হ্যা হ্যাঁ মনে পরেছে, তাের কোন এক
বন্ধুর সাথে দেখা হওয়ার পর তুই নেমে পরলি ।
-ঠিক বলেছিল কাহিনী হচ্ছে ঐ
বন্ধুকে নিয়ে।
-বল তারপর কি হল ।
-যে বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল তার নাম
বাবুল। আমি নামার পর তাের কথা জিজ্ঞেস করেছিল। আমি বললাম আমার ফ্রেন্ড
কলেজে যাচ্ছে তার লাভারের সঙ্গে দেখা করতে।
-বাবুল বলল, লাভারের নাম কি ?
-আমি বললাম, কেন দিপা।
-বাবুল একটু আশ্চার্য হয়ে বলল, কোন দিপা ?
- কোন দিপা
আবার তুই চিনিস মনে হচ্ছে !
-বল্ না কোন দিপা ?
সবকিছু বলার পর বাবুল বলল,
চিনতে পেরেছি তবে সে তাের বন্ধুর লাভার হবে কেন ও তাে আমার বন্ধুর লাভার।
-মনির একটু অবাক হয়ে বলল, সেটা আবার কেমন কথা! তাের কাছে কি কোন প্রমাণ আছে
?
-অবশ্যই আছে, তারা বিভিন্ন আপত্তিকর কায়দায় ছবি তুলেছে, সেই ছবিও আমি
তােকে দেখাতে পারবাে।
-বলতে বলতে মিস্টার জাকির বলল, বুঝতে পারলে বাবা মা
খেয়াল না রাখলে মেয়েরা কতদূর পর্যন্ত যায় ? যদি এ রকম কিছু হয় তাহলে
বুঝতে পারিবে কত গমে কত আটা।
পরের দিন সকালে আবার ড্রাইভারকে নিয়ে
বেড়িয়ে পরলাে রাসেলের কাছে
-রাসেল একটু রেগে, কি ব্যাপার আজ আবার এসেছাে
কেন?
- এমনি আসলাম বাসায় বসে বসে ভাল লাগছিল না।
-সব কিছুর বেশী বেশী হয়ে
গেলে কিন্তু সমস্যা আছে।
-কি সমস্যা ?
-তােমার বাবা মা বুঝতে পারবে।
-বুঝুক
আমি ভয় করি না ।
কচি আজ পালিয়ে
যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে কিন্তু রাসেলকে বলার সাহস পাচ্ছে না।
মনে মনে ভাবছে এখানে না, দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে বলতে হবে।
-কচি বলল, চলনা কোথাও যাই।
- আজ আমার বহু কাজ আছে যাওয়া অসম্ভব।
-চলাে না
প্লিজ
- ঠিক আছে যাচ্ছি তবে এক মাসের মধ্যে আর বলবে না।
-আচ্ছা বলবাে না।
ড্রইভারকে কারখানায় রেখে কচি ড্রাইভ করে নিয়ে যায় অনেক দূরে।
-অকেক্ষণ পর
রাসেল বলল, কি ব্যাপার এতাে দূর আসলে কেন ?
তিন ঘন্টা পথ পেরিয়ে ওরা
বসলাে এক পার্কে।
-কচি বলল, সত্যি করে একটা কথা বলবে ?
-বল কি বলবে ?
- আমি
যা বলবাে তাই শুনতে হবে।
-বল শােনার মত হলে শুনবাে।
-না তােমাকে শুনতেই হবে
-আচ্ছ
বল শুনবাে।
-তিন সত্যি বল ?
রাসেল হেসে উঠলাে। হাসি দেখে
-কি ব্যাপার হাসছাে
কেন ?
- তােমার তিন সত্যির কথা শুনে
- তিন সত্যির কথা শুনে হাসির কি আছে ?
-দুনিয়াতে তিন কথাটা যে এতাে প্রচলিত, সব কিছুতেই তিন। কোন কাজ করতে গেলে
তিন বারে বার। পুরস্কার দিতে গেলে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়। সব খানেই কাজে
লাগে এই গাণিতিক সংখ্যা তিন। ইসলামেও এই তিন সংখ্যা অনেক গুরুত্ব। যেমন ধর
নামাযের অযু করার সময় প্রত্যেক অঙ্গ তিন বার ধৌত করা, কবরে তােমাকে
জিজ্ঞেস করবে তিনটি প্রশ্ন, আবার তিন ব্যক্তির নামাজ মাথার এক হাত উপরেও
যায় না-
১। যে লােকদের ইমামতি করে অথচ লােকেরা তাকে পছন্দ করে না।
২। যে
স্ত্রী লােক তার স্বামীকে অসন্তুষ্ট রেখে রাত্রি যাপন করে।
৩। এমন দুই ভাই
যারা পরস্পরের সাথে লড়াই ঝগড়ায় লিপ্ত থাকে। -
তিনটি
জিনস থেকে খুব কম লােকই রক্ষা পেতে পারে-
১। কুধারণা
২। কুলক্ষণ গ্রহণ
৩।
হিংসা।
জীবনে সফল কাম হতে হলে তিনটি বিষয় মুছে ফেলতে হবে-
১। অবিশ্বাস।
২।
অসম্ভব।
৩। দুশ্চিন্তা।
এ গুলাে কথা শুনতে শুনতে কচি বলল, এসব কথা এখন
রাখাে আমার কথা শােন, আমার মাথা এখন হট হয়ে আছে।
- কেন ?
-বাবা মা আমাদের
ব্যাপারটা কোন দিনও মেনে নিবে না। সেটাতাে আমরা বুঝি তাই না ?
-তা অবশ্য ঠিক
-আজ বাবার ফেয়ার ওয়েল চল আজই আমরা পালিয়ে যাই।
-রাসেল অবাক হয়ে, মানে !
এটা কি করে সম্ভব, আমার কারখানা !
-অতাে কিছু বুঝি না , হয় তুমি আমাকে। চলে
যাবে কোথাও আর না হয় আমি যে দিক ইচ্ছে চলে যাবাে, বাসায় আর ফিরে যাচ্ছি
না। রাসেল মহা বিপদের মধ্যে। এ কি করে সম্ভব। আবার যদি পালিয়েও না যাই।
তাহলে কচির বাবা আমাকে খুন করে ফেলবে তবুও আমার সঙ্গে বিয়ে দিবে না। তাহলে
আমার কারাখানার কি হবে ? এ সব কথা ভাবতে ভাবতে রাসেল ঝটপট দাঁড়িয়ে কচির
হাত ধরে বলল, চলাে যাই।
-কচি বলল, কারখানা কি করবে ?
-তুষারকে দিয়ে দিবাে। ও
চালাবে।
-ও যদি না চালায় ?
-ওর কাছে বিক্রি করবাে
-ও যদি না কিনে তাহলে ?
-ও
কিনবে আমার কাছে এক বার কিনতে চেয়েছিল আমি বিক্রি করি নি।
তােমাকে টাকা
দিবে কিভাবে ?
-পরে জানিয়ে দিব কোথায় টাকা পাঠাতে হবে।
হায়রে
কারখানা সত্যিই অনেকদিনের অমানুষিক পরিশ্রম করা টাকা, বেঁচে দিতে খুব কষ্ট
হল তার। টাকাতাে নয় যেন নিজের গায়ের রক্ত। গায়ের রক্ত বললেও কম বলা
হবে। একদিন খালি হাতে ব্যাবসা আরম্ভ করেছিল । গরীবের ছেলে রাসেল, না কেউ
সহায় না কেউ সম্বল। ময়লা প্যান্ট পরে মােটর সারাতাে। আর প্রথম প্রথম অল্প
টাকায় গাড়ি ঠিক করতাে। তাতেই কয়েকটা বাঁধা খদ্দের জুটে গিয়েছিল, তা
দিয়ে তার পেট চলতাে।
-রাসেল বলল, পালিয়ে কোথায় যাবে ?
-চলাে রাজশাহীতে
যাই, সেখানে গেলে কেউ আমাদের চিনতে পারবে না । তুমি সেখানে গিয়ে একটা
কারখানায় কাজ নিবে আর আমি কোর্টে প্রাকটিস করবাে।
- কোথায় গিয়ে উঠবাে ?
সেখানে কি বাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে।
-কেন পাওয়া যাবে না পয়সা দিলে কি না
পাওয়া যায়, যত দিন বাড়ি না পাওয়া যায় ততদিন হােটেলে থাকবাে, টাকাতাে
আমি নিয়ে এসেছি কচির অনেক টাকা ছিল ব্যাংকে। সে দিনই টাকা সব তুলে নিয়েছে
কচি, তাছাড়া পরে আর টাকা পাওয়া যাবে না ।
গাড়ি নিয়ে সােজা রাজশাহী।
-কচি বলল, আর কিছুক্ষণ পরেই বাবা মা আমাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিবে।
-
রাসেল, তারপর তাঁরা পুলিশে খবর দিবেন।
- পুলিশকে এখন খবর দিবে না, কারণ
তাতে জানাজানি হয়ে যাবে, খবর যদি দেয় তবে দু-তিন দিন পরে দিবে। ততক্ষণে
আমরা হােটেলে উঠে পরেছি, হােটেলে আমাদের আসল নাম লিখবাে না।
-রাসেল বলল, এর
মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে, তাছাড়া কোন রক্ষা নেই।
কচি আইন পাশ করা
মেয়ে। তাকে আইন পাশ করাতে হবে না। সে জানে যে বিয়ে করতে যাচ্ছে এমন একজন
মানুষকে যার কোন সামাজিক মর্যাদা নেই, বাবা মা কখনই তাকে জামাই বলে গ্রহণ
করবে না, সে নাবালিকা নয়, সে যা করছে তা বুঝে শুনেই করছে।
অনেক সময়
পালিয়ে যাবার আগে মেয়েরা একটা চিঠি লিখে রেখে যায়, আমাকে তােমরা খোঁজ
করাে না। আমি নিজের ইচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে
তার দরকার নেই।
জীবনে
যে বাবা মার কাছে কখনও সে অনাদর পেয়েছে তা নয় বরং উল্টে বাবা-মার
একমাত্র চিন্তা ভাবনা। অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের পাত্র সে দেখেছে কিন্তু
রাসেলের মত এমন স্বাস্থ্য, এমন ভলাে ব্যবহার আর কারাে কাছ থেকে পায় নি।
তাদের ভাগ্যটা খুবই ভালাে। তাদের মাত্র দু'দিন হােটেলে থাকতে হয়েছিল। তার
পরেই কম ভাড়ায় একটা পাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া গেল। তারপর বিয়ে। বিয়েতে
তিন জন সাক্ষীর দরকার। তা তাও বেশী বেগ পেতে হলাে না। যে কারখানায় রাসেল
চাকরি পেলাে সেখানকারই তিনজন মিস্ত্রী স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়ালাে। একটা উৎসব
নেই, একটা শানাই বাজনা নেই, কিম্বা আলাের, লাল নীল রােশনাইও নেই। এমন কি
খাওয়ানাে-দাওয়ানাের পাটও নেই এ বিয়ে শুধু বিয়েই।
বলতে গেলে বিয়ে তাদের
আগেই হয়ে গিয়েছিল, এবার সরকারি ছাপা মারা বিয়ে। এরপর রাসেল যেমন
কারখানায় নিয়মিত হতে লাগলাে, ঠিক তেমনি একজন ভালাে সিনিয়র উকিলের
জুনিয়র হয়ে কচি জজ কোর্টে প্র্যাকটিস করতে লাগলাে।
সেদিন কচি কোর্ট থেকে
সিনিয়রের বাড়িতে কাজ করে বাড়ি আসতে আসতে রাত হয়ে গেল, আসতেই রাসেল বলল,
জানাে আজকে একটা কাণ্ড হয়ে গেছে
- কি কাণ্ড ?
. সাবিনা বলছিল বিকেল বেলা
দু’জন লােক এসেছিল আমাদের খুঁজতে।
-আমার কোন মক্কেল নয় তাে ?
-মক্কেল কেন
বিকেলে আসতে যাবে তাহলে তাে সে কোর্টে যেতাে।
-কচি একটু চিন্তিত সুরে বলল,
তাহলে কে ?
-আমার মনে হয় তােমার বাবা।
-হতভম্ব হয়ে, আমার বাবা রিটায়ার
হয়ে রাজশাহীতে এসেছেন ?
-আমার তাে তাই মনে হচ্ছে।
-তাহলে তাে ভালই হয়েছে,
এইবার সােজাসােজি বােঝাপড়া হয়ে যাবে। এতদিন যে ভয় ছিল তা কেটে যাবে। কী
বলে গেছে সাবিনাকে ?
-বলে গেছে আবার তারা কাল সকাল সকাল আসবে। সমস্ত রাতটা
উদ্বিগ্নতায় কাটলাে দু’জনেরই, ভাের হবার আগেই দু'জনেরই ঘুম ভেঙ্গে গেছে।
উঠে তৈরী হয়ে নিলাে।
কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারলাে না রাসেল। তার
কারখানায় সকাল আটটার মধ্যে হাজির । রইল শুধু কচি। সাবিনা রান্না নিয়ে
ব্যস্ত। একজন মক্কেল
চলবে..........


কোন মন্তব্য নেই