Header Ads

দুই পুরুষ (উপন্যাস) পর্ব- ৫


দুই পুরুষ

                              এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন

(উপন্যাস) পর্ব- ৫

- আমি বললাম আপনি অফিসে গেছেন আর ভাবি কোর্টে গেছে ।

- তা শুনে তারা কী বলল ?

-আর কিছু বলে নি ।

- বাড়ির ভাড়া তুমি কত বলেছ ?

-বলেছি আমি জানি না ।



খানিক পরে কচিও এসে গেল । যেদিন থেকে সে কোর্টে যেতে শুরু করেছে । সেই দিন থেকেই তার একজন ভাল সিনিয়র জুটে গিয়েছিল ।

ময়নুল হােসাইন নান্ন , খুব নামকরা এ্যাডভােকেট । তিনি বিশেষ সুনজরে দেখেছিলেন কচিকে ।

- তিনি বলেছিলেন , প্রথম প্রথম কোন আশা করাে না মা । এখন তােমার খুবই অসুবিধা হবে , কিন্তু হতাশ হয়াে না । আমি যখন প্রথম কোর্টে ঢুকি তখন টেগুৱ ভাড়াটাও কোন কোন দিন উঠতাে না । কিন্তু হতাশ হই নি আমি , তুমিও ধৈর্য হয়ে যেকো । একদিন সাকসেস আসবেই । সাকসেস হলে তখন আরাে সাবধান থাকতে হবে বড় পরিশ্রমের কাজ ।

সত্যিই প্রথম দু’বছর খুবই পরিশ্রম করতে হয়েছিল কচিকে । দিনের বেলা সিনিয়র এ্যাডভােকেট ময়নুল সাহেবের সংগে ঘুরতে হত । তারপর স্যারের বাড়িতে যেতে যেতে সন্ধ্যা বেলা । সন্ধ্যা থেকে আরম্ভ করে বহুদিন রাত ১১ টা ১২ টার আগে উঠতে পারে নি । তারপর ফাইল নিয়ে বাড়ি যেতে হয়েছে । রাত যেতে যেতে আইনের বই ঘাঁটতে হয়েছে ।

বেশী রাত হয়ে গেলে রাসেল বলত , এখনও জেগে আছ ? শােবে না তুমি ?

- কচি বলত , আজকে আমাকে একটু বেশী খাটতে হবে , বড় শক্ত কেসটা ।

সে সব দিনের কথা মনে আছে কচির । তখন সবে রাসেলের সংগে পালিয়ে এসেছে রাজশাহীতে । বাবা , মা তাকে খুঁজবে , পুলিশে খবর দিবে সবই সে জানত । জানত তার প্রতিশােধ নেবেই একদিন ।

প্রথম ভেবেছিল তারা দু'জন দেশের বাইরে চলে যাবে । কিন্তু টাকা ? পাসপাের্ট ? সে সব ব্যবস্থা করতে গেলে দেরি হয়ে যাবে , জানা জানিও হয়ে যাবে । অনেক ধকল অনেক হয়রানি তাতে । তারচেয়ে রাজশাহী যাওয়া ভাল , কেউ তাদের চিনতে পাবে না ।

রাসেল একটু ভয় পেয়েছিল , বলেছিল , যদি আমাকে জেলে পুরে দেয় তােমার বাবা ? তােমার বাবা তাে ডি সি ।

- আমি তাে আছি আমি তােমাকে বাঁচাব ।

বড় ভীতু রাসেল । এক মটরের কারখানায় সামান্য একটা মিস্ত্রীর কাজ করত স । সামান্য টাকার চাকরি ।

প্রথম যে দিন , দেখা সে দিনই ভালো লেগে গিয়েছিল কচির । কলেজ থেকে ফিরবার পথে মাঝ রাস্তায় গাড়িটা খারাপ হয়েছিল । ড্রাইভার গাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে কারখানায় নিয়ে এলাে ।

গাড়ির ইঞ্জিন বিগড়ে গেলে কারখানায় নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই , বিগড়ানাে গাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে যখন কারখানায় নিয়ে এলো তখন রাসেলই প্রথম দৌড়ে এসেছিল সাহায্য করতে । ড্রাইভার সাহেদ একলা ঠেলে তুলতে পারছিল না কারখানার ভিতরে ।

রাসেল কে ডাকতে হয় নি , সে নিজে থেকে এসেই জিজ্ঞেস করেছিল , এটা কার গাড়ি ?

- সাহেদ বলল , ডি সি সাহেবের ।

রাসেল বুঝে নিয়েছে ভেতরে যে আছে সে ডি সি জাকির সাহেবের মেয়ে । গাড়ির বনেট খুলবার আগেই বলল , আপনি গরমে বসে থাকবেন কি করে ? আপনার কষ্ট হবে ।

-কচি বলল , না থাক সমস্যা নেই ।

- তার চেয়ে আমি একটা চেয়ার এনে দিচ্ছি । আপনি সেখানে বসুন পাখার তলায় আরাম করতে পারবেন ।

বলে কারখানার ভিতর থেকে একটা গদি মােড়া হ্যান্ডেল ওয়ালা চেয়ার এনে দিল । উপরে সিলিং ফ্যান ঘুড়ছে । কচির খুব আরাম হল হাওয়ার তলায় বসে ।

- একটু ঠান্ডা পানি খাবেন ?

- কচি একটু মুচকি হেসে বলল , না থাক ।

- তাহলে একটু শরবৎ খান বলেই সে উধাও শরবৎ নেবার জন্য । একটা ঠান্ডা কোকের বােতল নিয়ে এসে বলল , নেন এটা খান ।

- এটা আবার আনতে গেলেন কেন , এর দাম কত ? বলে নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিচ্ছে । ঘামছেন দেখে এমনিই দিলাম ।

- রাসেল মাথা নাড়াল বলল , দাম আপনাকে দিতে হবে না , এটা আপনি ঘামছেন দেখে এমনই দিলাম।

- দাম না নিলে কিন্তু আমি এটা খাব না - তাহলে ওটা বিলের সংগে দিবেন ।।

- তবুও কচি আপত্তি করতে লাগল । বলল , না তবু আমি এ খেতে পারব না।

- তাহলে মনে করে নিন কোম্পানি আপনাকে খাওয়াচ্ছে ।

শেষ কালে পাখার তলায় বসে কোকটা খেতে বাধ্য হল , সে কোক খাচ্ছে আর রাসেলকে দেখছে ।

রাসেলের পরণে তখন চিট ময়লা একটা শর্ট প্যান্ট আর ঘাখি গা । সে তখন গাড়ির বনেট খুলে যন্ত্র পাতি পরীক্ষা করছে , তার শরীরের নড়া চার সংগে সংগে মাসেল গুলাে ফুলে ফুলে উঠছে । আগে রাসেলের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিল এবার মুগ্ধ হল তার শরীরের গড়ন দেখে ।

প্রায় আধ ঘন্টা কচিকে সেই পাখার তলায় ধুলাে ময়লার মধ্যে বসে থাকতে হয়েছিল সে দিন । কিন্তু এক পলকের জন্যও রাসেলের স্বাস্থের দিক থেকে তার নজর সরে যায় নি ।

-গাড়ি সারানাে শেষ হলে রাসেল এসে বলল , গাড়ি ঠিক হয়ে গেহে , আপনাকে অনেক কষ্ট দিলাম ।

-না ঠিক আছে , কত লাগবে ?

-টাকা এখন দিতে হবে না ।

- কখন দিতে হবে ?

-আমি বিল দিলে তখন টাকা দিবেন ।

- কবে বিল দিবেন ?

- সে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না , আমি সময় মতাে ঠিক বিল নিয়ে  যাব ।

সাহেদ গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে ।

- রাসেল বলল , গাড়িতে উঠুন গরমের মধ্যে আপনার খুব কষ্ট হল ।

- না কষ্ট আর কিসের , গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে তাে একটু কষ্ট হবেই ।

- আচ্ছা আস্সালামুআলাইকুম , এবার থেকে গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে আমার কারখানায় দিবেন , এটা আমার কারখানা ।

- কচি বলল , বাবা কে তাই - ই দিতে বলব , আচ্ছা আসি ।

তারপর একদিন কলেজ যাবার সময় কচি ড্রাইভার সাহেদ কে বলল , সাহেদ সেই মটরের কারখানায় একবার চল তাে ।

সাহেদ গাড়ি নিয়ে সেই কারখানায় উঠল ।

গাড়ি দেখেই দৌড়ে এলাে রাসেল । সে তখন অন্য গাড়ি মেরামতের কাজে ব্যস্ত ছিল । সে কাজ ছেড়ে দৌড়ে এসে বলল , কেমন আছেন ? গাড়ি কি আবার খরাপ হল ?

- ভাল । গাড়ির কিছুই খারাপ হয় নি , শুধু বলতে এসেছি আপনি বিলতাে পাঠালেন না ?

সে দিনও রাসেল সেই পােষাকে । শুধু একটা চিন্টু ময়লা শর্ট প্যান্ট আর মাসেল ভর্তি দেহ । সে বলল , তাড়াতাড়ি কিসের একটু হাত খালি হলেই আমি নিজে গিয়ে আপনাদের বাড়িতে বিল দিয়ে আসব ।

- আমি ভাবলাম আপনি হয়তাে ভুলে গেছেন ।

- না , মাস শেষ হলে তখন যাব ভাবছিলাম ।

- মাস শেষ হওয়ার দরকার কি ? আমি বিল নিয়ে এসেছি আজ নিবেন ।

- না , এখনও বিল তৈরী করা হয় নি । দিন দিন কাজ বাড়ছে , সেই সকাল ন’টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এক নাগাড়ে কাজ করতে হয় আমাকে ।

- কচি বলল , আমার ঠিকানা জানেন ?

-আপনার ঠিকানা কে না জানে । আপনার বাবার নাম বললে এক বাক্যে সবাই বাড়ি দেখিয়ে দেবে ।

- ঠিক আছে আসবেন একদিন । এই বলে কচি চলে গেল ।

একদিন বিকেল বেলা হঠাৎ রাসেল বাড়িতে এসে হাজির । আয়ার কাছে খবর পেয়েই বাইরে বেরিয়ে এলাে কচি । দেখল রাসেলের একেবারে অন্য রকম । চেহারা । পরণে সেই শর্ট প্যান্ট নেই । বেশ লম্বা ডােরা ডােরা দাগের প্যান্ট গায়ে খুব সুন্দর কালারের শার্ট ।

- ও আপনি ! আমি চিনতেই পারি নি ।

- হাসতে হাসতে রাসেল বলল , আপনাদের বাসায় ওই পােষাক পরে আসতে লজ্জা করল ।

- সেই পােষাকটাই কিন্তু বেশী ভাল লাগে ।

- আমরা মিস্ত্রী মানুষ , কালি , ধুলি , ময়লা নিয়েই আমাদের কাজ । তাই কারখানায় যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ ওই বিশ্রী পােষাক পরে থাকি । তাই বলে কি ওই পােষাক পরে এখানে আসা যায় ।

- কি খাবেন বলুন চা না কফি ?

- না , কিছুই খাব না ।

- তা হতে পারে না , আপনি সেদিন আমাকে কোক খাইয়ে ছিলেন , সেকি আমি ভুলে গেছি মনে করেছেন । কিছু খেতেই হবে । চা কফি না খান একটা কোক এনে দেই ।

- রাসেল আবার হাসল বলল , ধার শােধ দিচ্ছেন ? সে দিন ভাগ্যিস আপনার গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছিল তাইতাে আজ এত বড়লােকের বাড়িতে ঢােকার সুযােগ হল । নইলে মোটর মিস্ত্রীদের কেউ মানুষই মনে করে না ।

কচি ততক্ষণে আয়াকে কোক নিয়ে আসতে বলেছে ।

- কচি বলল , দিন আপনার বিলটা দিন ।

- অত তারাহুড়াে কেন ? আমাকে বুঝি শিগগির শিগগির তাড়িয়ে দিতে চান ?

- না না সে কি ! আপনি কোক খেয়ে তারপর যাবেন । আমি আয়াকে কোক আনতে বলেছি । রা

সেল পকেট থেকে বিলটা কচির দিকে বাড়িয়ে ধরল । কচি বিলটা দেখে অবাক বলল , এ কী ! মাত্র এই কয় টাকা চার্জ ?

- যে কয় টাকা বিল হয়েছে সে কয়টাকায় ধরেছি । বেশী ধরব কেন ?

কচি বিশ্বাস করল না । বলল , আপনি আধ ঘন্টা খাটলেন আর বিল করেছেন মাত্র এই কয় টাকা ! জানেন না ডি সিরা বড়লােক এত কম চার্জ করলে তাদের খারাপ লাগে ।

- রাসেল একটু অবাক হয়ে , সে কি !

- হ্যাঁ তাদের ইজ্জতে লাগে । বড়লােকদের পেটের অসুখ হলে সেটা তাদের লজ্জা । পেটের অসুখ হবে গরীবদের কারণ তারা গরীব লােক , আজে বাজে জিনিস খায় । আর বড়লােকদের রােগ হলে হবে ডায়াবেটিস , কিম্বা ব্লাড প্রেসার । বড় লােকদের বড় বড় রােগ না হলে তাতে তাদের লজ্জা করে । আর আপনি মােটর সারানাের চার্জ করলেন মাত্র এই কয় টাকা ?

- এ আমি নতুন কথা শুনছি আপনার কাছ থেকে ।

- কেন আপনি জানেন না ডাক্তাররা বড়লােকদের অসুখ হলে দামি দামি ঔষধ লিখে দেয় আর সেই একই রােগ গরীব লােকদের হলে কম দামী সস্তা ঔষুধ লিখে দেয় । তা খেয়েই ভাল হয়ে যায় ।

- রাসেল হাসতে হাসতে বলল , আপনার কথা শুনে ভালই লাগল ।

- তাছাড়া এর সঙ্গে কোকের দামটা ধরেন নি ।

ততক্ষণে একটা ট্রে করে আয়া কোক এনে সামনে ধরল ।

চলবে---------

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.