দুই পুরুষ (উপন্যাস) পর্ব-১০
দুই পুরুষ
এম, আব্দুল্লাহ আল মামুন
উপন্যাস- পর্ব-১০
না। কাজের পূর্ণতা এবং চারুতার জন্যে কখনও চিত্র আঁকছেন, কখনও মডেল তৈরী
করছেন, কখনও মাপজোক নিচ্ছেন- সংগে সংগে আত্মন্নতির জন্য বই পুস্ত ক পড়ারও
কামাই নেই। এর কিছু কাল পরে আরও উন্নত জ্ঞান লাভের জন্যে তিনি লন্ডনে রয়েল
একাডেমীতে ভর্তি হন। জীবন্ত মানুষের মুর্তি নির্মাণ, চিত্র বিদ্যা প্রভৃতি
কাজে তিনি অতিশয় খ্যাতি অর্জন করেন। সহিষ্ণুতা, সাধনা অধ্যাবসায় এবং
কঠিন পরিশ্রম আর তার সঙ্গে তাঁর প্রতিভা তাঁকে বড় করেছিল তিনি অতিশয়
দানশীল ছিলেন, কিন্তু সে কথা কেউ জানত না।
যে কোন কাজই করুণ- বাইরের উপদেশে
বিশেষ কিছু লাভ হয় না। মানুষ মানুষকে শিখাতে পারে না। মানুষ মানুষকে একটু
দেখায় মাত্র, নিজের ওস্তাদ নিজেকেই হতে হবে। পরের মুখের দিকে তাকিয়ে
থাকলে জগতের কোন কাজই কৃতিত্ব লাভ করা যায় না। সাধনার প্রাণ- বিশ্বাস এবং
আত্মনির্ভরতা। কোথা থেকে যে বুদ্ধি যােগায়, পথ পরিস্কার হয়ে আসে তা ভাবলে
আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। আল্লাহ মানুষকে এমনি পূর্ণ করে গঠন করেছেন যে, তার
পরের কাছে হাত পাতবার আবশ্যকতা খুব অল্পই আছে।
মানুষের কাজ এই ভেবেই সমাদর
লাভ করে। মানুষ প্রথম প্রথম কোন কথা, কোন সাধনার দিক ফিরে তাকায় না।
মানুষের এ স্বভাব তা বলে ভাবনা করলে চলবে না। জগতে এখনও অনেক কিছু নতুন করে
তৈরী করবার আছে। জগতের যা কিছু প্রয়ােজন, তা মানুষের ত্যাগের ফলে তৈরী
হয়ে থাকে-তারপর কাজে নেমে পড়লেই হয়। জাতির ধন সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্যে,
পল্লির দুঃখ দূর করবার জন্যে এখন দেশের মানুষের অগ্রসর হওয়া মাত্র বাকী।
হাত-পা গুটিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা না করে হাত-পা খাটিয়ে শক্তি ও
মনুষ্যত্বর সদ্ব্যবহার করে নিজের এবং জাতির মঙ্গল চেষ্টা করাই উত্তম। জাতির
না হােক, সমাজের না হােক দেশের ছেলেরা যদি আপন আপন অভাবে মিমাংসা করতে
পারে সাধু জীবন-যাপন করে আপন আপন মা-বােনের সেবা করতে পারে, প্রতিবেশীর
স্বার্থে আঘাত না করে, তাহালেই যথেষ্ঠ।
আর্থার হ্যালাস বলেছেন-“ইংরেজ জাতির
ভিতর থেকে শ্রমিক, শিল্পী, মিস্ত্রী ফেলে দাও, সমস্ত জাতিটা অন্তঃসারশুন্য
হয়ে পড়বে। সমস্ত জাতীর হেদটা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়বে
তাই বলছি, কয়েকজন রাজকর্মচারী এবং দেশের ভদ্রলােক এরাই জাতির শক্তি এবং
প্রাণ, এ কথা পাগল ছাড়া আর কেউ মনে করে না। কোন মানুষের কৃতিত্ব, বিশেষত্ব
এবং গুণ চাপা থাকবে না সে রাজমিস্ত্রী, গায়ক, কামার, স্বর্ণকার শিল্পী
যাই হােক মানুষের অন্তৰ্নিহিত
ক্ষমতা তার কাজের ভিতর দিয়ে তাকে শ্রেষ্ঠত্ব এবং সম্মান দান করবেই।
জর্জ
কেম্প একজন সামান্য লােক ছিলেন। তার পিতার সম্পত্তি ছিল কিছু গরু ও ছাগল।
প্রথম জীবনে তিনি সামান্য একজন মিস্ত্রীর কাছে শিক্ষানবিলী করেন। স্থাপত্য
শিল্পে তার বিশেষ অনুরাগ ছিল। ভাল উল্লেখ যােগ্য নতুন পুরাতন সুদৃশ্য
অট্টালিকা দেখলেই তিনি তার চিত্র গ্রহণ করতেন। এই উদ্দেশ্য তিনি ইউরােপ
পরিভ্রমণ করতে মনস্থ করেন। তাই পায়ে হেঁটে ইউরােপের বৃহৎ বৃহৎ প্রাচীন
অট্টালিকা, দুর্গ এবং গির্জা পরিদর্শন করেন এবং সেগুলির নক্সা হাতে গ্রহণ
করেন। এডিনবরা শহরের স্কট জীবনের সাধনা। মনুমেন্টের নক্স প্রস্তুত করবার
প্রতিযােগীতায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। তারই নক্সা অনুযায়ী
এডিনবরায় এই বিখ্যাত সাহিত্যিক স্মৃতি মন্দির নির্মিত হয়।
অসংখ্য
প্রকারের মানুষ নিজ নিজ জীবনকে উল্লেখযােগ্য করে তুলতে পারে। যে দেশের
মানুষ এটা বুঝে না, সে দেশের লােক দাস ও গােলামের জাতি ছাড়া আর কি ?
চাকরিকেই সম্মানের মাপকাঠি মনে করা যার নেই ভুল। জাতিকে সমৃদ্ধশালী করে
তােলবার পথ এ নয়। জাতির শক্তির পশ্চাতে অনন্ত বিচিত্র জীবনধারা দেশের
শিরায় খেলে যাচ্ছে। মিসর, পারস্য, এশিয়া মাইনর প্রভৃতি ছােট ছােট দেশেও
ব্যবসা বানিজ্য দ্বারা অর্থাগমের বিবিধ পন্থা আছে। আমাদের দেশেও থাকা চাই।
একজন আর একজনের নাড়ী ছিড়ে খেলে কয়েকজন লােক ছাড়া বাকী সকল লােকই মারা
যাবে। মিথ্যা ও মুখতার বিরুদ্ধে যুবক সমাজকেই বিদ্রোহী হতে হবে। অত্যাচারী
মুরুব্বীর দল যে চাকরীকেই সম্মানের জীবন মনে করে, নিষ্ঠুর হস্তে সে
মানসিকতাকে ভেঙ্গে না দিলে আর উপায় নেই। পরের গলগ্রহ হয়ে অসাধু পথে
দাসত্বের লৌহ চাপে, অভাবের অভিশাপে মানুষের জীবনী শক্তি এবং মনুষ্যত্ব
দুই-ই- নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে। শ্রমকে শ্রদ্ধার
সঙ্গে গ্রহণ করুণ। কালি-ধুলার মাঝে, রৌদ্র-বৃষ্টিতে কাজের ডাকে নেমে পরুণ।
বাবু হয়ে ছায়ার পাখার তলে থাকবার কোন দরকার নেই। এ হচ্ছে মৃত্যুর
আয়ােজন। কাজের ভিতরে কুবুদ্ধি, কু- মতলব মানব চিত্তে বাসা বাঁধতে পারে না।
কাজে শরীরের সামর্থ জন্যে, স্বাস্থ্য, শক্তি, আনন্দ, ফুর্তি সবই লাভ হয়।
মন্দ খেয়ে আনন্দ করবার কোন প্রয়ােজন হয় না। পরিশ্রমের পর যে অবকাশ লাভ
হা, তা পরম আনন্দের অবকাশ, শুধু চিন্তার দ্বারা জগতের হিত সাধন হয় নি।
মানব জাতির সমস্ত কল্যাণ বাহুর শক্তিতেই সাধন হয়েছে। মানুষ্য,
পীড়িত-লজ্জিত মনুষ্যকে উদ্ধার করেছে জগতের
জালিমকে বিনষ্ট করেছে, রাক্ষসের মুখ থেকে নির্দোষ দূর্বল মানুষকে
বাঁচাচ্ছে। কাপুরুষ ছাড়া মানুষের বাহুকে অন্য কেউ অশ্রদ্ধা করে না।
-মিসেস
জাকির হুট করে বলে উঠলাে, তিন মেয়েতাে তাই, এক মেয়ে হলে এরকম হতাে না।
শুধু
চিন্তা করে মানুষ পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে সমর্থ হয়। মানব সমাজে মানুষের
সঙ্গে কাজে, রাস্তায়, কারখানায় মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে মানুষ নিজেকে
পূর্ণ করে। চিন্তা এবং পুস্তক মানব চিত্তের পাপড়ি খুলে দেয় মাত্র, বাকি
কাজ সাধিত হয় সংসারের কর্ম ক্ষেত্রে।
তুষার এগুলাে পড়তে পড়তে কচি ও
রাসেল কারখানায় আসলাে, এসে দেখে সাহেদ বিছানা পেরে ভিতরে ঘুমাচ্ছে, তুষার
বসে বসে বই পড়ছে। তুষারকে দেখে রাসেল অবাক !
-বলল, কিরে তুই এখনাে বাসায়
যাস নি ? এখানে বসে বসে কি করছিস। বই পড়ছিলাম, বই পড়তে পড়তে কখন যে সময়
চলে গেছে বুঝতেই পারি নি। তাের এখানে খুব সুন্দর সুন্দর বই আছে।
- রাসেল
বলল, যখন একটু সময় পাই তখন বসে বসে পড়ি। তাের দরকার হলে নিয়ে যাস।
-আচ্ছা
এই বইটা নিয়ে গেলাম শেষ করে দিয়ে যাব, বেশ ভাল লাগছে এই বইয়ের
কথাগুলাে।
-কাউকে দিশ না, বই হারায় বেশী।
- তুষার যেতে যেতে বলল, ঠিক আছে।
রাসেল কচিকে বলল, অনেক দেরি হয়ে গেছে আর দেরি না করে বাসায় যাও, তােমার
বাবা মা বকা দিবে।
-না না দিতেই পাড়বে না, এমন কথা বলবাে বিশ্বাস না করে উপায়
নেই, থাকো তাহলে যাই।
-গাড়ির কোন সমস্যা হলে এসাে।
-কেন সমস্যা না হলে আসতে
পারবাে না ?
- কেন ! কেন ! কেন!
-বেশী বেশী আসলে তােমার বাবা মা বুঝতে
পারবে, আর শেষে বুঝতে পারলে আমও যাবে ছালাও যাবে।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
এদিকে চকি
যেতে যেতে ড্রাইভারকে ঠিক করে নিল, ঠিক কি আর এমনি হয় ! পকেটে ১০০ টাকার
একটা নােট গুজে দিল ব্যাস সব ঠিক।
বাড়িতে
ঢুকতে না ঢুকতেই ভিতর থেকে শব্দ আসলাে, দাঁড়াও কোথায় ছিলে এতক্ষণ ?
কচি
এরকম কর্কশ শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেছে। মনে মনে ভাৰছে নির্ঘাত কেউ দেখে
ফেলেছে, মিথ্যে কথা বলেই যাব যা বলে বলুক।
-কচি একটু সংকোচ হয়ে বলল, এক
বান্ধবীর বাড়ি গিয়েছিলাম, সে আসতেই দিবে না, অনেক কিছু বলার পড় ছাড়লাে
বিশ্বাস না হয় ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে দেখ।
- ঠিক আছে ঘরে যাও এ রকম দেরি
যেন আর কোন দিন না হয়। কচি আর কোন কথা না বাড়িয়ে সােজা ঘরে চলে গেল।
-মিসেস জাকির একটু রাগ করে বলল, তুমি মেয়েটার উপর এরকম রাগ করলে কেন?
-একটু
আকটু রাগ করতে হয়, রাগ না করলে কোথায় যাবে না যাবে ঠিক আছে ?
-আমার মেয়ে
কোথাও যাবে না।
-যাবে না বললেতাে হবে না, মেয়েকে শাসন না করলে মাথায় উঠে
যাবে, পরে কোন অঘটন ঘটে আমাদের মান সম্মান সব ডুবাবে।
-আমার মেয়ে এরকম হতেই
পারে না।
-তােমার ধারণা ভুল, সুযােগ মানুষকে চোর বানায় কথাটা মনে রাখবে।
-
মিসেস একটু মন খারাপ করে বলল, বুঝেছি।
-ও রকম মুখ পেঁচার মত করে আছ কেন ?
তােমার ঐ বান্ধবী কি যেন নাম ও মনে পরেছে ইয়াছমিন তার মেয়ে দিপার কি
হয়েছে জান ? শুনলেতাে তােমার মাথা হ্যাং হয়ে যাবে।
-কি হয়েছে আমিই তাে
জানি না।
-তা জানবে কেন, দিপার বাবা মা দিপার প্রতি খুব একটা নজর দিতাে না।
কোথায় যেতে না যেতাে অত গ্রাহ্য দিত না। ভ্রুক্ষেপ না দেওয়ায় তার সাথে
এক ছেলের সম্পর্ক হয়। তাদের সম্পর্ক চলে দিঘ্য দিন, দু'জনের পরিবারই
জানতাে, তবে খুব একটা বেশী না একটু আকটু। ছেলেটি অন্য জেলায় থেকে লেখাপড়া
করতাে, ছেলেটি দিপাকে ভীষণ ভালবাসতাে। একদিনের জন্য ছেলেটি এসে দিপাকে
দেখে যেতাে। দিপা ছেলেটির সঙ্গে দেখা করতাে কিন্তু দিপার মা মেয়েকে নিয়ে
বেশী চিন্তা করতাে না।
-শােন আগে তারপর বলাে, দিপার সাথে যে ছেলেটির সম্পর্ক ছিল সে ছেলের নাম মনির
আর মনিরের এক বন্ধু আছে নাম কবির। কবির মনির মাঝে মধ্যেই বলতাে দোস্ত
তুইকি সত্যি সত্যি দিপাকে বিয়ে করবি ?
মনির বলতাে, কেন করবাে না, কি হয়েছে
বল ?
- না তেমন কিছু না এমনি বললাম ।
এ কথা জিজ্ঞেস করলেই মানির টেনশানে পরে
যায়। মনির যখনি বলে হ্যা বিয়ে করবাে তখনই কবিরের মন খারাপ হয়ে যায়।
একদিন মনির কবিরের উপর চেপে বসলাে, কি হয়েছে বল আজ না বললে তােকে ছাড়বাে
না। তােকে বলতেই হবে।
মনির বলবে না কবির ছাড়বে না। বাধ্য হয়ে কবির বলল,
দোস্ত তুই দিপাকে বিয়ে করিস না।
-মনির অবাক হয়ে, বলিস কি তুই ! বিয়ে
করবাে না মানে ?
-হ্যাঁ দোস্ত তােকে ভালর জন্যই বলছি।
-খারাপের কি দেখেছিস ?
দেখেছি বলেই তাে বলছি।
-প্রমাণ আছে তাের কাছে ?
-অবশ্যই! প্রমাণ না থাকলে
তােকে বলি ? কি প্রমাণ বল ?
-আচ্ছা ঠিক আছে বলছি তবে তার আগে একটা কৌতুক
শােন
-তুই এমন কেন ? প্রত্যেক বিপদ আপদের সময় বা মানুষকে টেনশানে রেখে তুই
কৌতুক বলিস, কারণ কি ?
- আসলে আমার কৌতুক কেউ শােনে না তাই এরকম প্যাচে
ফেলে কৌতুক বলতে হয়।
-আচ্ছা ঠিক আছে বল। তারাতারি বল।
হাসবি কিন্তু
-ঠিক আছে
হাসবাে।
-নাহ থাক বলবাে না তাের এই ব্যপারটা একটু বেশী সিরিয়াস। এ সময়
কৌতুক মানাচ্ছে না। আর একটু নরমাল হলে হতাে। শােন কিছু দিন আগে..........
চলবে.............


কোন মন্তব্য নেই